ইরানের রাজধানী তেহরানের কাছে দামাভান্দ কাউন্টির আবসার্ড এলাকায় গত শুক্রবার সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হওয়ার পর হাসপাতালে মারা যান দেশটির শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ।

পারমাণবিক শক্তির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বিষয়টি ইরান বরাবরই অস্বীকার করলেও পশ্চিমা বিশ্বের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ফাখরিজাদেহকে তার দেশের গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির মূল পরিকল্পনাকারী ও ইরানের বোমার জনক বলে আখ্যা দিয়ে থাকে।

জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপে ২০০৩ সালে বন্ধ করে দেওয়া এক সমন্বিত পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে তিনি নেতৃত্ব দেন বলে ধারণা করা হয়।

কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সম্পৃক্ততার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে কিনা তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফাখরিজাদেহর নিরাপত্তা যথেষ্ট গুরুত্ব দিত ইরান সরকার। যখন তার ওপর হামলা হয়, তখনও তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল বেশ কয়েকজন দেহরক্ষী।

বিবিসির এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফাখরিজাহেদকে হত্যার কারণ পারমাণবিক প্রকল্পে তার সম্পৃক্ততা নয়, বরং রাজনৈতিক কারণেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এক্ষেত্রে দুটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বিবিসির প্রতিবেদনে। প্রথম কারণটি হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেনের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক উন্নয়নের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তাকে নস্যাৎ করা। আর দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে- ইরানকে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করা।

ফাখরিজাদেহ সম্পর্কে যা জানা গেল

পশ্চিমা বিশ্বের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেসামরিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেওয়া ও পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহে ইরানের আগের পদক্ষেপে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন ফাখরিজাদেহ। যদিও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি চেষ্টার অভিযোগ ইরান বরাবরই অস্বীকার করে আসেছে।

ইরানের বিশিষ্ট এ বিজ্ঞানী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে। অনেকে তাকে এ প্রকল্পের জনক বলে থাকেন।

ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রেজিস্ট্যান্স অব ইরানের (এনসিআরআই) তথ্যমতে, মোহসেন ফাখরিজাদেহ ১৯৫৮ সালে কোম শহরে এক শিয়া মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইরানের ইমাম হুসেইন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ফাখরিজাদেহ দেশটির উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনির এ সমর্থককে ইরানের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ বলে দেশটির এক সূত্র ২০১৪ সালে রয়টার্সকে জানিয়েছিল। সূত্রটি আরও জানায় যে ফাখরিজাদেহর তিনটি পাসপোর্ট ছিল এবং হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের জন্য এ বিজ্ঞানী এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রচুর ভ্রমণ করতেন।

ফাখরিজাদেহ সব সময় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বাস করতেন এবং এ বিজ্ঞানীকে জাতিসংঘের পারমাণবিক তদন্ত কর্মকর্তাদের সামনেও হাজির করেনি ইরান। তিনি খুব কমই প্রকাশ্যে আসতেন। বাইরের খুব কম লোকই তার চেহারা কেমন বা তার সাথে দেখা হয়েছে তা বলতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ২০১৫ সালের চূড়ান্ত মূল্যায়ন তালিকায় একমাত্র ইরানি বিজ্ঞানী হিসেবে ফাখরিজাদেহর নাম উল্লেখ করা হয়। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি সামরিক খাতে ব্যবহারের অংশটি দেখাশোনা করতেন তিনি।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের গোপন পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্প হিসেবে কথিত 'আমাদ' পরিকল্পনার দেখভাল করতেন তিনি। সংস্থাটি তাদের ২০১১ সালের প্রতিবেদনে তাকে 'আমাদ' পরিকল্পনার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে বলে, ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির দক্ষতা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনে তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।