মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের কারণ এবং বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে তার প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্নেষকদের অভিমত মিশ্র। কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বন্দ্বই মিয়ানমারে ১ ফেব্রুয়ারির সেনা অভ্যুত্থানের প্রধান কারণ। অং সান সু চিকে ঘিরে মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের প্রভাব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই চীনের মদদে ঘটেছে এ অভ্যুত্থান। মূলত এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে চীন পশ্চিমা বিশ্বকে শক্তি দেখিয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটিতেও পরে তার প্রতিফলন ঘটেছে।
বিশ্নেষকদের কেউ আবার বলছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতার একাংশ মাত্র ভোগ করতেন স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। গত নির্বাচনে ৮৩ শতাংশ ভোট পেয়ে সু চি সেই ক্ষমতার বিস্তৃতি ঘটানোর চেষ্টা শুরু করেন। সেনাবাহিনী তখনই এ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। যার জের ধরে প্রথমে নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তোলা হয় এবং শেষ পর্যন্ত এই সেনা অভ্যুত্থান ঘটেছে। ফলে এই অভ্যুত্থান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বের নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের অধ্যায় আসছে।
দেশ-বিদেশের কূটনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের ফলে এর সরাসরি কোনো বিরূপ প্রভাব উপমহাদেশের রাজনীতিতে পড়ার আশঙ্কা নেই। তবে এই অভ্যুত্থান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাত প্রকট হলে তা ভারত ও বাংলাদেশের সামনে নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এ প্রসঙ্গে সমকালকে বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখা হবে। এ ছাড়া এই অভ্যুত্থানের অন্য কোনো প্রভাব নিয়ে এ মুহূর্তে বিবেচনার কিছু নেই। 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়'- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে যে কোনো ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ :মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর গত কয়েকদিন বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে তুরস্কের সেন্টার ফর ক্রাইসিস অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ সিফেত্তিন ইরোলের বিশ্নেষণ।
তুরস্কের সরকারি বার্তা সংস্থা আনাদোলুতে ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রকাশিত ওই বিশ্নেষণে চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক সিফেত্তিন লেখেন, মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের মূল কারণ হচ্ছে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব। অং সান সু চি ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমাদের প্রিয় এবং সু চি নিজেও পশ্চিমা গণতন্ত্রের আদর্শ ও শাসনতান্ত্রিক রীতিতে বিশ্বাস করেন। গৃহবন্দি থাকার সময় পশ্চিমা দুনিয়া তাকে 'শান্তির দূত' হিসেবে সম্মানিত করে; তার মুক্তির জন্য সেনা সরকারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এক পর্যায়ে অং সান সু চি স্টেট কাউন্সেলর হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসেন। যদিও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ সবকিছুতেই ছিল।
সিফেত্তিনের মতে, গত নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি ৮৩ শতাংশ ভোট পাওয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা বিস্তারের সুযোগ পায়। নির্বাচনের পর সু চির কয়েকটি বক্তৃতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সমালোচনা এবং গণতন্ত্র চর্চার বিস্তৃতি ঘটানোর ঘোষণা নিশ্চিতভাবেই সেনাবাহিনীকে বিচলিত করে। পশ্চিমামুখী নীতির প্রতি সু চি সরকারের ক্রমাগত ঝোঁক আরও আগেই চীনকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তাই নির্বাচনের ফল চীনকেও প্রতিযোগিতায় অনেকটা পেছনে ফেলে। মূলত সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এবং নিরাপত্তা পরিষদে এর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব ঠেকিয়ে দিয়ে চীন আরও একবার মিয়ানমারের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এবং পূর্ণ কর্তৃত্বের প্রকাশ ঘটাল। ভবিষ্যতে মিয়ানমারকে ঘিরে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের আরও প্রকট দ্বন্দ্বের রূপ দেখার জন্য বিশ্বকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
এ ব্যাপারে খানিকটা ভিন্নমত ব্যক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত কূটনৈতিক-রাজনৈতিক সাময়িকী 'ফরেন পলিসি'তে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক বিশ্নেষক অ্যান্ড্রু ন্যাচেমসন। গত বৃহস্পতিবার তিনি লিখেছেন, সেনা অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যতটা গড়ে উঠেছিল, তা আবারও ধ্বংসের মুখোমুখি। এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে আবারও 'গণতন্ত্র' সুদূর পরাহত হয়ে উঠল। এর অর্থ দেশটি আবারও চীনের পুরোপুরি কুক্ষিগত হবে। মিয়ানমারে মানবাধিকারকর্মী, মুক্ত বুদ্ধির মানুষ, ভিন্ন মতাবলম্বী এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওপর নিয়ন্ত্রক সরকারের নিপীড়ন বাড়বে। পরিস্থিতিটাই এমন যে, মিয়ানমারের সেনা শাসকের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিন্দাও জানানো যাবে না। কারণ এখানে তাদের ক্ষমতার ঘোরতর সমর্থক চীন রয়েছে।
অ্যান্ড্রু ন্যাচেমসন লিখেছেন, এখানে রাশিয়ার ভূমিকাও অনেকটা চীনের মতোই। জাপানের বিপুল বিনিয়োগও সরকার পরিবর্তনের ফলে মিয়ানমার থেকে চটজলদি সরে যাবে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গত কয়েক বছরের বিনিয়োগও সরিয়ে নেওয়া কঠিন। ফলে এর আগে মিয়ানমারের সেনা সরকার যতটা দুর্বল ছিল, বর্তমানের সেনা সরকার তার চেয়েও অনেকটাই শক্তিশালী। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলো অতীতের মতো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে; তবে সেটা সেনা সরকারকে কতটা বেকায়দায় ফেলবে, তা বলা মুশকিল। আবার পশ্চিমাদের চ্যালেঞ্জ করে ক্ষমতায় আসা সেনা সরকার প্রবল শক্তি নিয়ে স্থায়ী হলে সেটাও হবে পুরো এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
দেশি বিশেষজ্ঞদের ভাবনা :সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবীর বলেন, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্রদের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখেও মিয়ানমারের সেনা সরকার দীর্ঘ সময় টিকে ছিল মূলত চীনের সমর্থনে। এবারও চীনের সমর্থন স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। তবে বিশ্বে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তারের যে লড়াই চলছে, সেটাই এখন হবে মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশ এবং চীনের অবস্থানের ভিত্তি। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার যদি পশ্চিমাদের চাপ এড়াতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে, সেটি হবে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বিষয়। তাই অপেক্ষা করতে হবে এবং দেখতে হবে, মিয়ানমারের সেনা সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের চাপ বা ব্যবস্থা কতটা কঠোর হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ, ভারতসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর রাজনীতি কিংবা অর্থনীতিতে মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের কোনো প্রভাব পড়ার কারণ নেই। কারণ মিয়ানমারে সেনা সরকারের অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। কারণ মিয়ানমারে যখন অং সান সু চির সরকার ছিল, তখনও দেশটির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণই কার্যত সেনাবাহিনীর হাতেই ছিল। বরং বাংলাদেশ, ভারত, জাপান বা এ অঞ্চলের অন্য যে দেশই হোক, মিয়ানমারের সরকারে যে-ই থাকুক, শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গেই সম্পর্ক রক্ষা করবে এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে। কিন্তু মিয়ানমার ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হলে তার বড় প্রভাব উপমহাদেশেও পড়তে পারে। তখনই সামনে আসবে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশ কিংবা ভারতের মতো দেশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হয়। বাংলাদেশ আগেও এ ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জে সফল হয়েছে। এখনও যদি সে ধরনের চ্যালেঞ্জ আসে, বাংলাদেশ তা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারবে বলে বিশ্বাস করি।


বিষয় : নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামনে

মন্তব্য করুন