দীর্ঘদিন পর হলেও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নতুন করে বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার খবর ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক। শনিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোন প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো হবে, তা নির্ধারণে আগামী মঙ্গলবার দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের যে সভার কথা বলা হয়েছে, তাকে স্বাগত জানাই। আমরা জানি, নানা অভিযোগ তুলে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করলেও দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১২ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী নিতে রাজি হয় মালয়েশিয়া। এর পর ২০১৬ সালে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে যুক্ত করে জি-টু-জি প্লাস পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতা স্মারকে সই করলেও পাঁচ বছর মেয়াদি ওই সমঝোতা চুক্তির আওতায় মাত্র ১০টি জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিকে লোক পাঠানোর অনুমতি দিলে এর বিরোধিতা করে বিদেশে কর্মী প্রেরণকারী এজেন্সিদের সংগঠন বায়রা।

গুটিকয়েক এজেন্সি অনুমতি পাওয়ায় আমরা দেখেছি, প্রত্যেক কর্মীর অভিবাসন ব্যয় সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার নির্ধারণ করা হলেও কোনো কর্মীই তিন লাখ টাকার কমে মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার তদন্তে জি-টু-জি প্লাসে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির বিষয় বেরিয়ে আসার পর সে দেশের নতুন সরকার যেভাবে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়, তা সত্যিই লজ্জাজনক। যদিও দেশটিতে পুনরায় শ্রমিক পাঠাতে বাংলাদেশ এর পর থেকেই চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বিশেষত আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কয়েক বছর ধরে মালয়েশিয়ার সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে যাচ্ছে। গত বছরের আক্টোবরেও বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য দেশটির শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, সাধারণ এজেন্সি মালিকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, ২০১৬ সালের মতো হাতেগোনা কয়েকটি এজেন্সিকে নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটই কর্মী পাঠানোর কাজ পেতে যাচ্ছে। আমরা বিস্মিত, কীভাবে ওই সিন্ডিকেট কাজ পাবে! যাদের অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ইতোপূর্বে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হারিয়েছে; পুনরায় তাদের কাজ দেওয়া শুধু অন্যায়ই নয়; ভবিষ্যতেও বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। এমনকি বাংলাদেশের এক হাজার তিনশ রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে মাত্র ১০টিকে অনুমতি দেওয়া অমানবিক ও বৈষম্যমূলক। আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে 'সিন্ডিকেট নির্মূল ঐক্যজোট'-এর ব্যানারে আন্দোলনে নেমেছেন জনশক্তি ব্যবসায়ীরা। রোববার তারা সংবাদ সম্মেলনে সব বৈধ এজেন্সিকে জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার যে দাবি জানিয়েছেন, তার সঙ্গে আমরা বহুলাংশে একমত।

আমরা প্রত্যাশা করি, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের অনলাইন সভায় কর্মী প্রেরণের জন্য এজেন্সির তালিকা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বৈধ সব ব্যবসায়ীর বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। না হলে অনেক এজেন্সি শুধু ব্যবসা করার সুযোগই হারাবে না; একই সঙ্গে দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী পাঠানোর সুযোগ হারাতে পারে। আমরা দেখেছি, ২০১৬ সালে জি-টু-জি প্লাস পদ্ধতিতে পাঁচ বছরে ১৫ লাখ কর্মী পাঠানোর ঘোষণা থাকলেও দুই বছরে মাত্র পৌনে তিন লাখ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় যান। তাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বিদ্যমান ব্যবস্থায় অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশেরও সব এজেন্সি ব্যবসা করার সুযোগ পায়। সৌদি আরবসহ অন্যান্য শ্রমবাজারে যদি সব বৈধ এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পায়, তাহলে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সবাই সুযোগ পাবে না কেন? আমরা মনে করি, মঙ্গলবারের গুরুত্বপূর্ণ সভার এজেন্ডায় অভিবাসন ব্যয় কমানো, দুর্নীতিমুক্ত অভিবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। দিন দিন বেকারত্ব বাড়ছে বলে কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশ ও বিদেশ উভয় দিকেই নজর দিতে হবে। মালয়েশিয়ায় নতুন শ্রমবাজার খোলার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। শ্রমবাজার নিয়ে নূ্যনতম শঙ্কা তৈরি হোক; তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

মন্তব্য করুন