পর্যটকদের নতুন জায়গা বা শহর দেখানোর জন্য  টুরিস্ট গাইডের বিকল্প নেই। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ পেশায় সাধারণত পুরুষদের দেখা যায়। তবে আফগানিস্তানের মতো দেশ যেখানে নারীরা এখনো অনেক পেছনে পড়ে আছে, সেখানে একজন টুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ শুরু করেছেন ফাতিমা নামের এক নারী।

২২ বছর বছর বয়সী ফাতিমা বর্তমানে আফগানিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হেরাতে পর্যটকদের গাইড হিসেবে পথ দেখাচ্ছেন। তিনি দেশটির প্রথম নারী টুরিস্ট গাইড।

সম্প্রতি ফাতিমা সিএনএনকে জানিয়েছেন তার টুরিস্ট গাইড হয়ে ওঠার গল্প। ফাতিমা বেড়ে উঠেছেন আফগানিস্তানের গ্রামাঞ্চলীয় গোহর প্রদেশে। আট ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ফাতিমা ছাড়া তার সব ভাইবোনই বিবাহিত। ফাতিমা জানান, তার এলাকায় কোনো স্কুল নেই। তিনি ভেড়া প্রতিপালনের কাজ করতেন। তার ইচ্ছে ছিল পড়াশোনা করার। ভেড়ার পাল থেকে যদি ভালো আয় হয় তাহলে তিনি পড়াশোনার সুযোগ পাবেন- এমন শর্তে তার পরবিার তাকে পড়তে দিতে রাজি হয়েছিল।

ফাতিমা জানান, তার যখন নয় বছর বয়স, তখন তার পরিবার হেরাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। যদিও তিনি কিছু অনানুষ্ঠানিক পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন, তবে তিনি বেশিরভাগ সময় মাকে সাহায্য করার জন্য বাড়িতেই থাকতেন। তবে পড়ালেখার অদম্য আগ্রহ থেকে ফাতিমা নিজে নিজে অনেক কিছু শিখেছেন। যখন তিনি খাতা কিনতে পারতেন না তখন বালিতে লাঠি দিয়ে লিখতেন। বিবিসি রেডিও শুনে ইংরেজি শিখতেন।

ফাতিমা কখনও ভাবেননি তিনি টুরিস্ট গাইড হবেন। এটা নারীদের জন্য প্রচলিত কোনো পেশাও নয়। আবার টুরিস্ট গাইডও যে কোনো পেশা হয় এটাও তার জানা ছিল না।

তবে ফাতিমা সবসময়ই স্বপ্ন দেখতেন ঘরের বাইরে কাজ করার। তিনি জানান, তার ভাইবোনদের বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ কারণে তিনি ভেবেছিলেন, প্রথা ভেঙে তিনি কোনো কাজে যোগ দেবেন।

প্রথমেই ফাতিমা ইংরেজির চর্চা শুরু করেন। এজন্য তিনি ফেসবুকে আইডি খোলেন এবং ইতিহাসে আগ্রহী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। যারা আফগানিস্তানকে কেবল যুদ্ধ ও সংঘাতের জায়গা হিসাবে জানে তাদের ধারণা বদলাতে নিয়মিত পোস্ট লিখতে শুরু করেন ফাতিমা।

ইরান ও তুর্কমেনিস্তানের সীমানা থেকে একটু দূরে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আফগানিস্তানের হেরাত অঞ্চলের নানা ইতিহাস লিখতে শুরু করেন ফাতিমা। এরপরই সব কিছু ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। ফেসবুকে অনেকেই তার পোস্টে মন্তব্য লেখা শুরু করেন। ২০২০ সালে বিগ টম নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে নক করে ফাতিমার কাছে হেরাতের আশেপাশে যে জায়গাগুলো আছে তা দেখাতে পারবেন কিনা জানতে চান। এভাবেই বিদেশি পর্যটকদের সাথে ফাতিমার যোগাযোগ শুরু হয়।

পরে টম আফগানিস্তানে গিয়ে ফাতিমার সঙ্গে দেখা করেন এবং তার নির্দেশনায় বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করেন। ফাতিমার জ্ঞান ও জানাশোনা দেখে টম সেখানকার একটি ট্রাভেল এজেন্সিকে ফাতিমাকে টুরিস্ট গাইড হিসেবে নিয়োগের পরামর্শ দেন। এভাবেই ২০২০ সালের শেষের দিকে স্ব-শিক্ষিত ফাতিমা দেশটির প্রথম নারী টুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজের সুযোগ পান।

ওই ট্রাভেল এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা জেমস উইলকক্স জানান, দলে একজন নারী গাইড থাকায় পর্যটকরা আফগানিস্তানকে নতুন দৃষ্টিতে দেখছেন।

ফাতিমা জানান, কোনো কিছুর পথ প্রদর্শক হওয়া অবশ্যই সহজ কাজ নয়। তাকেও অনেক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এমনকি তার পরিবারের সদস্যসহ অনেকে তাকে এ ধরনের কাজ যেকোনো নারীর জন্য বিপজ্জনক বলে সাবধান করেছে।

ফাতিমা জানান, স্থানীয় বাজারে পর্যটকদের গাইড হয়ে যাওয়ার পর শিশুরা তার দিকে পাথর ছুঁড়েছিল। লোকজন তাকে খারাপ বলে অনেক গালিগালিাজও করেছে।

ফাতিমা জানান, তার সহকর্মী এবং পর্যটকদের উৎসাহ তাকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ সবসময়ই আমার জীবনের একটি অংশ। আমি যদি হাল ছেড়ে দিই তবে অন্য নারীরা কখনই শুরু করবেন না। তিনি আরো জানান, কাজে যাওয়ার সময় তিনি পোশাকের ব্যাপারে বেশ সতর্ক থাকেন। এছাড়া কোনো দলের সঙ্গে রাতে কোথাও যান না তিনি।

টুরিস্ট গাইডের আয় থেকে ফাতেমা তার পারিবারকে এখন আর্থিক সহায়তা করছেন। চাকরির পাশাপাশি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ফাতেমা বর্তমানে হেরাত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। একটা শরণার্থী স্কুলে ৪১ জন মেয়েকে ইংরেজিও পড়ান তিনি।

ফাতিমা বলেন, আমি দেশের প্রথম নারী টুরিস্ট গাইড হতে পারি, কিন্তু আমি এ পেশায় শেষজন হতে চাই না।

জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, আফগানিস্তানে মাত্র ১৯ শতাংশ নারী ঘরের বাইরে কাজ করেন।