কক্সবাজারের টেকনাফের লাকিংমে চাকমাকে চাকমাকে অপহরণ, ধর্মান্তর ও জোর পূর্বক বিয়ে এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায় বিচার চেয়েছেন শিক্ষক, সাংবাদিক ও আদিবাসী নেতারা। আন্তজার্তিক নারী দিবসকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের স্বতন্ত্র নিউজ পোর্টাল আইপি নিউজ'র আয়োজনে মঙ্গলবার রাতে এক ভার্চুয়াল আলোচনায় এ দাবি জানানো হয়। আইপি নিউজ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আন্তোনি রেমার সঞ্চালনায় 'লাকিংমের জন্য ন্যায় বিচার' শীর্ষক এই আলোচনায় বক্তারা বলেন, এ দেশের প্রান্তিক মানুষ রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেক দূরে। তাদের কান্না রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীণ কণা বলেন, আদিবাসী নারীরা দেশের ভালনারেবল গ্রুপের মধ্যেও আরো ভালনারেবল। ফলে লাকিংমে চাকমার ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা খুব সহজ বলে ধরে নেয়ার চিন্তা করাটা স্বাভাবিক। তিনি বলেন, লাকিংমে এবং তার বাবা-মা সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়গতভাবে ক্ষমতাশালী নয়। লাকিংমের প্রান্তিকতা সাতটি বা আটটি মাত্রায়। কাজেই যে কোনো কারণেই লাকিংমেকে ধর্ষণ করা সহজ, নিপীড়ন করা সহজ, ধমান্তরিত করা সহজ। নারী আন্দোলন জাতিগত সীমার মধ্যে বন্দি না থেকে সব স্তর থেকে নারী নিপীড়নের প্রতিবাদ করা উচিত বলে মনে করেন এই শিক্ষক।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারহা তানজীম তিতিল বলেন, খুব স্পর্শকাতর ও মর্মান্তিক ঘটনা লাকিংমের সাথে ঘটে গেছে। তার ঘটনার আদ্যোপান্ত আলোচনা করাটায় মর্মান্তিক। সভা সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষ হিসেবে একজন মানুষের সাথে অন্যায় করলে সেটার শাস্তি হয়ে যাওয়াটায় স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের প্রয়োজনে যে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো আমরা নির্মাণ করেছি সেগুলো তা করেনি। সেই সংস্থাগুলোকেই লাকিংমের ন্যায়বিচারে ভূমিকা নিতে হবে। এই সংস্থাগুলো যাতে আরও সচল থাকে তার জন্য সবাইকে কথা বলতে হবে। নানা শঙ্কার মধ্যেও আইন রক্ষাকারী বাহিনী এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবে বলে আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য মেইনথেইন প্রমিলা বলেন, লাকিংমে চাকমার সাথে এত রকমের ঘটনা ঘটার পরও এর হোতারা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আদিবাসী নারীদের সাথে এ রকম আরও নির্মম ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। কিন্তু তা সামনে আসে না। বিউটি পার্লারে কর্মরত আদিবাসী নারীরা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন দাবি করে তিনি বলেন, তাদেরকে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার পরও কাজ করতে বাধ্য করা হয়। তাছাড়া ছুটি এবং পারিশ্রমিক না দেওয়ার ব্যাপারটিও যুক্ত। ছুটি না থাকায় এই নারীদের বাধ্য হয়ে গর্ভপাত করতে হয়। 

লাকিংমে চাকমার ঘটনা নিয়ে রিপোর্টিংয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দৈনিক সমকালের স্টাফ রিপোর্টার জাহিদুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চরম অবহেলা, তদন্তে পক্ষপাতিত্ব ও হত্যা কিংবা আত্মহত্যার প্ররোচনা দেখে মনে হয়েছে লাকিংমে চাকমার ঘটনা আমাদের কাছে নারী নিপীড়নের জলন্ত উদাহরণ। লাকিংমের বাবা টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি (এখন কারাগারে) প্রদীপের কাছে গেলে তাকে বিভিন্ন ধরণের হুমকিধমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সমাজে নারী নিপীড়ন ও সহিংসতা বাড়ছে দাবি করে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য চন্দ্রা ত্রিপুরা বলেন, আদিবাসী নারীরা নানা ধরণের সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হন। তখন মনে হয় কেবল নারী হিসেবে নই, একজন আদিবাসী হিসাবেও আমাদেরকে এসবের শিকার হতে হয়। কিন্তু এই ঘটনাগুলোর কোনোটির ন্যায় বিচার আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাছ থেকে হয়েছে বলে আমরা এখনও বলেতে পারি না।