তেরোটি স্টেট ও তিনটি ফেডারেল টেরিটোরি নিয়ে গঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া। ৩ লাখ ২৯ হাজার ৬১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে ২০২০ সালের হিসাবে ৩ কোটি ২৭ লাখ ৩০ হাজারের মতো জনসংখ্যা রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে পরবর্তী ৫০ বছরেরও বেশি সময়ে নিয়মিতভাবে ৬ দশমিক ৫% হারে জিডিপি (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন) বৃদ্ধির হার নিশ্চয়ই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির প্রতি সবার আলাদাভাবে অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। 

শিল্পকারখানার দ্রুত বিস্তার, যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিধান, সর্বোপরি অবকাঠামোগত উৎকর্ষ সাধনে দেশীয় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিদেশি শ্রমিকদের অবদানও অনস্বীকার্য। ২০১৯ সালের বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, মালয়েশিয়াতে বৈধ ও অবৈধ মিলে প্রায় ৩০-৩২ লাখ অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন। বিদেশি শ্রমিকদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, পাকিস্তান ও ভারতের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন।

মূলত বাংলাদেশিদের কাছে কর্মক্ষেত্র হিসেবে মালয়েশিয়া আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে শুরু করে ১৯৯০ সালের পর থেকে এবং ধীরে ধীরে এই দেশটিতে বাড়তে থাকে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি দুই লাখ ৭৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন খাতে কাজের জন্য মালয়েশিয়া এসেছেন। মাঝে এই সংখ্যা কমলেও ২০১৬ সালে উভয় দেশের একাধিক শ্রম সংগঠন ও মালয়েশিয়ার সাধারণ জনগণের বিরোধিতার মুখে ১৫ লাখ শ্রমিক নিয়োগের চুক্তি ২ লক্ষাধিক শ্রমিক নিয়োগের মাধ্যমে শেষ হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক পরবর্তীকালে অবৈধ হয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুক্তির অস্পষ্টতা, নিয়োগকৃত কোম্পানির জবাবদিহির অভাব, অপর্যাপ্ত বেতন, আবাসনের সমস্যাসহ মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদাসীনতায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক বাধ্য হয় অবৈধ হতে। এছাড়া, ২০১২-১৩ সাল থেকে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন নামসর্বস্ব কলেজের অধীনে ছাত্র ভিসায় আসাদের বড় একটা অংশই পরবর্তী সময়ে অবৈধ হয়ে যায়।

ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া আসা অনেক পর্যটকই নির্ধারিত সময় শেষ হলেও দেশে ফেরত যান না। এর পাশাপাশি মানব পাচার চক্র সক্রিয় তো রয়েছেই। বিদেশ বিভূঁইয়ে যেকোনো দেশের নাগরিকদের জন্য সে দেশের দূতাবাস কিংবা হাইকমিশনের ভূমিকা থাকে অগ্রগণ্য। সেদিক থেকে মালয়েশিয়া প্রবাসীরা যেন সৎভাইয়ের মতো! অথচ এই দেশে বিশ্বের অন্য দেশগুলো থেকে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে বাংলাদেশিদের অভিবাসন ব্যয় সর্বোচ্চ! একই খাতে, একই চুক্তিতে নেপালের একজন শ্রমিক বাংলাদেশি টাকায় মাত্র ৪০-৫০ হাজার খরচ করে এলেও বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সেটা ৩-৪ লাখের মতো! সম্প্রতি মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী একটি পত্রিকার প্রকাশ, 'মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনের হাতে বাংলাদেশিসহ ২০৫ জন আটক'। আটক বাংলাদেশি শ্রমিকেরা অবৈধ। গত ৫ বছরের মালয়েশিয়া প্রবাসজীবনে খুব কাছ থেকেই দেখেছি একজন প্রবাসী কেন অবৈধ হয়! মেনে নিচ্ছি কিছুক্ষেত্রে আমাদের স্বল্পশিক্ষিত কোনো কোনো শ্রমিকের হয়তো অবৈধ হবার পেছনে তাদেরই দোষ আছে কিন্তু মোটা দাগে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা মালয়েশিয়ায় বিদ্যমান বাংলাদেশ হাইকমিশন কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না।

কোনো দেশে শ্রমিক পাঠাতে গেলে অবশ্যই সম্পাদিত চুক্তিতে চুক্তির মেয়াদ, শ্রম ঘণ্টা, ঘণ্টাপ্রতি মজুরি, সাপ্তাহিক ছুটি, বার্ষিক ছুটি কিংবা আবাসন ব্যবস্থার সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকা উচিত এবং এগুলোর যথাযথ মনিটরিংও জরুরি। সেদিক থেকে মালয়েশিয়া প্রবাসীরা চরম অবহেলিত, বঞ্চিত! শ্রম আইন অনুযায়ী ৮ ঘণ্টা বেসিক উল্লেখ থাকলেও প্রবাসী শ্রমিকদের সিংহভাগই ১০-১২ ঘণ্টা বেসিক হিসেবে কাজ করে থাকেন। প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে বাংলাদেশ হাইকমিশন হওয়া উচিত আমাদের ভরসার প্রথম জায়গা, অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে রাজধানী কুয়ালালামপুরে অবস্থিত অন্যান্য দেশের যতগুলো দূতাবাস ও হাইকমিশন আছে তার মধ্যে আমাদের হাইকমিশনই একমাত্র যেখানে পাসপোর্ট রিনিউ করতে গেলে দালালের দ্বারস্থ হতে হয়, না হলে ভিসা শেষ হয়ে যাবার পরেও পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যায় না। করোনাকালীন অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে হাইকমিশন পাসপোর্ট রিইস্যু আবেদন গ্রহণ শুরু করে। তখন মনে হয়েছিল যে, দালালপ্রথা হয়তো এবার আর থাকবে না, কিন্তু বিধি বাম! দালাল প্রথা তো টিকে আছেই, সেই সঙ্গে বেড়েছে দালালদের সার্ভিস চার্জ!

করোনা বিস্তারের পরে হাইকমিশনের প্রথম দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশি শ্রমিকদের খোঁজ-খবর নেওয়া, কাজ হারানো শ্রমিকদের পাশে যতটুকু সম্ভব দাঁড়ানো! ওই সময়েও হাইকমিশনের দেওয়া ৫ কেজি প্যাকেটের এক প্যাকেট চাল, ৫/৬ পিস আলু, ২৫০-৩০০ গ্রাম মসুরের ডাল এবং এক প্যাকেট তেলসহ সাহায্য প্যাকেজ প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক হাসির খোরাক জুগিয়েছিল! গত বছর অন্তত ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন বাহিনীর হাতে আটক হয়ে জেল খাটার পরে দেশে ফেরত যান এবং এখনও যাচ্ছেন। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে দূর প্রবাসে এসে নিঃস্ব হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এর দায়ভার কি শুধুই স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত এই শ্রমিকদের? যাদের শ্রমে-ঘামে শক্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তারা আর কতদিন এভাবে অভিভাবকহীন থাকবেন? তাদের দেখার কি কেউই নেই?

মন্তব্য করুন