ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ঘুরেফিরেই আসছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। অনুপ্রবেশ ইস্যুকে নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার করেছে বিজেপি। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য তৃণমূল কংগ্রেসকে দায়ী করেছে তারা। তবে ইস্যুটিকে পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এ প্রসঙ্গে মমতা সাফ জানিয়ে দিলেন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে আসা সবাই ভারতের নাগরিক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, 'কে বলেছেন তারা নাগরিক নয়। বিজেপি ঠিক করে দেবে কে নাগরিক কে নাগরিক নয়?' গত শুক্রবার হাওড়ায় নির্বাচনী প্রচারে এসব কথা বলেন মমতা।

এদিকে শনিবার পঞ্চম ধাপে জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, দার্জিলিং, উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও পূর্ব বর্ধমানের ৪৫ আসনে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বুথে অসুস্থ হয়ে বিজেপির এক এজেন্ট মারা গেছেন। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে বিজেপি-তৃণমূলের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

চতুর্থ ধাপের রক্তক্ষয়ী ভোটের পর পঞ্চম ধাপের ভোট নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়। মূলত মোদি, মমতা ও অমিত শাহর নির্বাচনী প্রচার ঘিরেই উত্তেজনার পারদ বাড়ছে। গত শুক্রবার হাওড়ার জনসভায় মতুয়া, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে সরব হন মমতা। তিনি বলেন, আপনারা সবাই নাগরিক। মতুয়া, আদিবাসী, রাজবংশী সবাই নাগরিক। তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার অধিকার বিজেপির নেই।

মোদির সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর নিয়ে মমতা বলেন, 'কি মোদি বাবু, অন্য সময় আপনি বলেন মমতা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী ঢোকাচ্ছে। আর ভোটের সময় (মতুয়াদের সঙ্গে) চুপিচুপি গিয়ে দেখা করছেন, বলছেন- ভোট কাটতে হবে। ভোটের সময় মতুয়াদের কাছে গিয়ে বলছেন, আমি দেখা করতে এসেছি। এতদিন কেন করেননি?'

বাংলাদেশে সফরসঙ্গী না করা নিয়েও মোদির দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন মমতা। তিনি বলেছেন, 'বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে পছন্দ করেন। এ জন্য এর আগে যতবার বাংলাদেশে গেছেন, মোদি ফোন করে বলেছেন। মোদিকে পছন্দ না করলেও তার সঙ্গে আমি বারবার গেছি। কিন্তু এবার তো আমায় বলেননি। কারণ, এবার ভোটের খেলা। এটি বাংলাদেশকে আসল ভালোবাসা নয়। সেজন্যই আপনি (মোদি) গিয়েছিলেন এবং সেজন্যই মমতাকে সঙ্গে নেননি। এরপর যদি মমতাকে কোনো দিন বলেনও তবু যাব না। যদি যেতে হয় একা যাব।'

মমতা আরও বলেন, 'বাংলাদেশকে আমি ভালোবাসি। সে দেশে যাব। তবে রাজনীতি করতে যাব না। আমি যা বলি সামনে বলি। আমি বলছি, মতুয়ারা নাগরিক, তো আপনারা নাগরিক। আমি এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তাই বাজে কথা বলতে পারি না। নরেন্দ্র মোদি মিথ্যা কথা বলতে পারেন, অমিত শাহ পারেন। তাদের কোনো দায়বদ্ধতা বাংলায় নেই।'

অন্যদিকে, শনিবার পঞ্চম দফার ভোটে শান্তিপুরে বিজেপি কর্মীদের গুলিতে এক তৃণমূল কর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে অভিযোগ উঠেছে। গয়েশপুরেও অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। ভোট গ্রহণের কাজ বন্ধ রেখে তৃণমূলের সংসদ সদস্য ও অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তীর সঙ্গে কর্মকর্তাদের সেলফি তোলা নিয়ে অভিযোগের মুখে দায়িত্ব থেকে এক পোলিং অফিসারকে সরিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

মধ্যমগ্রামে কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক জওয়ানের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ান তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। চাকদার স্বতন্ত্র প্রার্থী কৌশিক কোমরে বন্দুক নিয়ে ঘোরায় এলাকাবাসী তাকে ধাওয়া দেয় এবং পরে পুলিশ সেটি উদ্ধার করে। সল্টলেকের নয়াপট্টিতে বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগে বিজেপির প্রার্থী সব্যসাচী দত্তকে ঘিরে বিক্ষোভ করেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। কল্যাণীর বকুলতলায়ও দু'দলের মধ্যে উত্তেজনা দেখা যায়। বর্ধমান উত্তরে সরাইটিকরে বিজেপি এজেন্টসহ চারজনকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। বিজেপি এজেন্টের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। কামারহাটির ১০৭ নম্বর বুথে অসুস্থ হয়ে বিজেপি এজেন্টের মৃত্যু হয়েছে। মিনাখাঁয় বিজেপি এজেন্ট রহস্যজনকভাবে 'নিখোঁজ'। বুথে ঢুকতে মদন মিত্র ও সুজিত বসুকে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে।

মোদির ফোনকলে আড়িপাতার অভিযোগ :মমতার ফোনকল ফাঁস হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছে তৃণমূল। শনিবার নির্বাচন কমিশনে করা অভিযোগে তারা বলেছে, মুখ্যমন্ত্রীর ফোনকলে 'অবৈধ' ও 'বেআইনি'ভাবে আড়িপাতা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তৃণমূল। তৃণমূলের সাংসদ ডেরেক ও'ব্রায়েন, সদ্য তৃণমূলে যোগ দেওয়া যশোবন্ত সিনহা ও পূর্ণেন্দু বসু কমিশনে অভিযোগ দাখিল করেন।

এবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে আট ধাপে। শনিবার  পঞ্চম ধাপের ভোট হলো। ২৯ এপ্রিল অষ্টম ধাপের ভোটের পর ২ মে একযোগে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।