ভুয়া খবর প্রকাশের হুমকি দিয়ে বা নানাভাবে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করে আসছিল তারা। মানুষকে ভড়কে দিতে ভাড়া করা গাড়িতে চড়ে ক্যামেরা নিয়ে দলবদ্ধভাবে হাজির হতো। টার্গেট ব্যক্তি ও আশপাশের কিছু ছবি তুলে বলা হতো- 'আপনার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে।' এভাবে কিছুক্ষণ হম্বিতম্বি করার পর তারা যেত মূল প্রসঙ্গে। মোটা অঙ্কের টাকা দিলে খবর প্রকাশ-প্রচার করবে না বলে জানাত। ভুক্তভোগী অনেকে বাধ্য হয়ে তাদের দাবি করা টাকা দিয়ে দিতেন। নামসর্বস্ব বিভিন্ন গণমাধ্যমের পরিচয়পত্র বহনকারী কথিত সাংবাদিকরা নিজেদের মধ্যে সেই টাকা ভাগ করে নিত।
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় এমন প্রতারণা করে আসছিল একটি ভুয়া সাংবাদিক চক্র। তাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল মানুষ। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর আবদুল্লাহপুরে হা-মীম গ্রুপের স্টাফ বাসে হামলা ও চাঁদা দাবির ঘটনায় তাদের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে তাদের নানা অপকর্ম। গতকাল শুক্রবার তাদের আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ সমকালকে বলেন, সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের মতো ভুয়া সাংবাদিকদের তালিকাও পুলিশের কাছে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে গাজীপুরের টঙ্গীর নিশাদনগরে হা-মীম গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ কালেকশন লিমিটেড থেকে স্টাফ বাসে তেজগাঁওয়ের প্রধান কার্যালয়ে আসছিলেন কর্মীরা। আবদুল্লাহপুর এলাকায় তাদের পথরোধ করে একটি মাইক্রোবাস। সেটি থেকে নেমে কয়েকজন নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বাসটির চালকের সহকারীকে মারধর শুরু করে। বাধা দিতে গেলে হা-মীম গ্রুপের চার কর্মীকে মারধর করে তারা। সেইসঙ্গে ভুয়া খবর প্রচারের ভয় দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে।
এ ঘটনায় উত্তরা পূর্ব থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা হয়েছে। এর আগে ঘটনাস্থল থেকে হামলাকারীদের পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ। তারা হলো ঝর্ণা আক্তার মিতু, ফারুক আহমেদ, সাখাওয়াত হোসেন সাগর, ওজিউল্লাহ খোকন ও মো. বিপ্লব। পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী ঝর্ণা কথিত দৈনিক এই বাংলার স্টাফ রিপোর্টার, ফারুক সাপ্তাহিক উত্তরা বাণীর সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বিপ্লব ঢাকা টিভির ক্যামেরাপারসন, ওজিউল্লাহ ক্রাইম প্যাট্রোল বিডির প্রতিনিধি এবং একই প্রতিষ্ঠানের ইনভেস্টিগেটিভ করেসপনডেন্ট সাগর।
উত্তরা পূর্ব থানার ওসি মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, গ্রেপ্তার পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে হাজির করা হয়। তবে শুনানি শেষে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সুমি চৌধুরী ও মো. ইফতেখার নামে তাদের দুই সহযোগী পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ওসি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তাদের একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্য বলে মনে হয়েছে। তাদের কথিত অফিসের ঠিকানায় গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। সাধারণত প্রতিটি গণমাধ্যম নিজস্ব পরিবহন ব্যবহার করে। অথচ এখানে দেখা যাচ্ছে, একটি গাড়িতে তারা সাত-আটজন ছিল, যারা বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মী বলে পরিচয় দিচ্ছে। নিজেদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারেও তারা ঠিকঠাক তথ্য দিতে পারেনি।
তদন্ত সংশ্নিষ্টরা জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা আদৌ সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত নয়। তাদের কথিত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোও নামসর্বস্ব। তারা মূলত কিছু পরিচয়পত্র তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি বা ব্যবসায়ীকে টার্গেট করে ভুয়া খবর প্রকাশের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে। বেশিরভাগ মানুষ তাদের ব্যাপারে সম্যক ধারণা রাখেন না বলে দাবিকৃত টাকা দিয়ে দেন। তবে মাঝেমধ্যে এমন চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। এই চক্রটির পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এরই মধ্যে একজনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের আরও কিছু ঘটনার ব্যাপারে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
উত্তরা পূর্ব থানার পরিদর্শক (অপারেশন) নূর আলম মাসুম সমকালকে বলেন, তদন্তে প্রতারণার অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিষয় : ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য

মন্তব্য করুন