করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার দ্বিতীয় ডোজের ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার। প্রথম ডোজ গ্রহণকারী ১৩ লাখের বেশি মানুষের জন্য দ্বিতীয় ডোজের মজুদ নেই স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে। ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা টিকা চুক্তিমতো পায়নি বাংলাদেশ। কবে পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই; কিন্তু টিকা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে ঘাটতি মেটাতে বিকল্প পথে চেষ্টা শুরু হয়েছে। অক্সফোর্ডের টিকার মজুদ আছে কিন্তু ব্যবহার করছে না এমন দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে সরকার। এরই মধ্যে সাতটি দেশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মিশনগুলোতে অক্সফোর্ডের টিকার চাহিদার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে কোনো একটি বা দুটি উৎস থেকে টিকা পেলে প্রথম ডোজ পাওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ পেতে সমস্যা হবে না।
সূত্রটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও সুইডেনে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার মজুদ আছে; কিন্তু ব্যবহার করা হচ্ছে না। ঢাকায় এসব দেশের দূতাবাসগুলোতে গত ১০ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত চিঠি পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই চিঠিতে অক্সফোর্ডের টিকার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে অব্যবহূত টিকা পেতে আগ্রহের কথা জানানো হয়। চিঠিতে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে দেশগুলোর সহায়তা চাওয়া হয়। তবে এখনও কোনো সাড়া মেলেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সমকালকে বলেন, 'অক্সফোর্ডের টিকার মজুদ আছে কিন্তু প্রয়োগ করছে না- এমন সাতটি দেশকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। টিকা ফেলে রাখলে মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। সুতরাং ব্যবহার না করলে সেগুলো যাতে আমাদের দেওয়া হয়, সেজন্য তাদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। কিনে কিংবা যে কোনো প্রক্রিয়ায় আমরা টিকা পেতে চাইছি। কারণ দেশে প্রথম ডোজ গ্রহণকারী একটি বড় অংশের দ্বিতীয় ডোজের টিকার মজুদ নেই। সুতরাং যে প্রক্রিয়ায় হোক না কেন, আমরা টিকা পেতে চাই।'
পররাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ছয় কোটি ডোজ মজুদ আছে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা ব্যবহার করছে না। দেশটি মডার্না, ফাইজার-বায়োএনটেক ও জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা ব্যবহার করছে। সরকার ওই টিকা পেতে আবেদন জানিয়েছে। ঢাকায় দেশটির দূতাবাসে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখনও কিছু জানানো হয়নি। একইভাবে বেলজিয়ামে ১৫ লাখ ডোজ এবং ডেনমার্কে ২০ লাখ ডোজ মজুদ আছে। ওই দেশ দুটিও অক্সফোর্ডের টিকা ব্যবহার করছে না।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সমকালকে বলেন, 'সাতটি দেশ ছাড়াও অক্সফোর্ডের টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে- এমন অন্য দেশগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে চিঠি পাঠিয়ে টিকার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে বলা হয়েছে। নির্দেশনা পাওয়ার পর মিশনগুলো তৎপর রয়েছে। তবে এখনও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।'
প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'যত সংখ্যক মানুষের দ্বিতীয় ডোজের ঘাটতি রয়েছে, ভারত থেকে যথাসময়ে তা আসবে বলে আশা করি। কারণ প্রথম ডোজ দেওয়া ব্যক্তিরা অন্য কোনো কোম্পানির টিকা নিতে পারবেন না। সুতরাং এই দ্বিতীয় ডোজ পেতে অন্তত ভারত সহায়তা করবে।'
শাহরিয়ার আলম বলেন, রাশিয়া ও চীনের টিকার বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তির আলোকে মে মাসে রাশিয়া থেকে টিকা আসবে। এরপর চীনের টিকাও আসবে। একই সঙ্গে দুটি দেশের টিকার উৎপাদনও হবে বাংলাদেশে। সুতরাং ভবিষ্যতে টিকা নিয়ে আর সংকটে পড়তে হবে না।
দ্বিতীয় ডোজের সময়সীমা পরিবর্তনের চিন্তা :স্বাস্থ্য বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ভারত থেকে টিকা না এলে দ্বিতীয় ডোজের সময়সীমায় পরিবর্তন আনা হতে পারে। অক্সফোর্ডের টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণের পর চার থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। দেশে প্রথমে চার সপ্তাহ পর এবং পরে আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার সুযোগ যেহেতু রয়েছে, সেটি কাজে লাগানো হবে। সে ক্ষেত্রে আরও এক মাস সময় পাওয়া যাবে। এর মধ্যে টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
কেনা ও উপহার মিলিয়ে এ পর্যন্ত এক কোটি তিন লাখ ডোজ অক্সফোর্ডের টিকা কোভিশিল্ড হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে গতকাল পর্যন্ত ৮৬ লাখ ২৫ হাজার ৩৫০ ডোজ টিকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রথম ডোজ পাওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার জন্য আরও ৩০ লাখ ১০ হাজার ৯৬২ ডোজ টিকার প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারের হাতে মজুদ আছে ১৬ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫০ ডোজ টিকা। আর ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩১২ ডোজ টিকার ঘাটতি রয়েছে। এই টিকা দিয়ে আগামী ১০ থেকে ১২ দিন চলতে পারে। এরপর টিকা না এলে ১৩ লাখের ওপরে মানুষ নির্ধারিত সময়ে দ্বিতীয় ডোজের টিকা পাবেন না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, 'দ্বিতীয় ডোজের ১৩ লাখের মতো টিকার ঘাটতি নিয়ে এখন কিছুটা উদ্বিগ্ন। এর বাইরে টিকা নিয়ে আর সংকট নেই। কারণ রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে টিকার চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ওই দুটি দেশ থেকে টিকা কেনা হবে। মে মাসেই রাশিয়া থেকে ৪০ লাখ ডোজের মতো টিকা আসতে পারে। চীনের উপহারের ছয় লাখ ডোজের মতো টিকাও দ্রুত চলে আসবে। এ ছাড়া রাশিয়া ও চীন বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনেও সম্মতি প্রকাশ করেছে। তারা প্রযুক্তি ও কাঁচামাল সরবরাহ করবে আর বাংলাদেশে সক্ষমতা আছে- এমন কোম্পানিগুলো টিকা উৎপাদন করবে।'
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রাশিয়া ও চীনের পক্ষ থেকে টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এরপর টিকা উৎপাদনের প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ড করতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এর পরই উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হবে। এর আগে রাশিয়া ও চীন থেকে টিকা কিনবে সরকার। এর বাইরে কোভ্যাক্স থেকেও টিকা আসবে। সুতরাং টিকা নিয়ে সংকট হবে না।

মন্তব্য করুন