অর্ধশতক আগে ১৯৭১ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ কমপেল্গক্স-৩৯-এর প্যাড থেকে স্যাটার্ন ভি রকেটে চেপে চাঁদে পাড়ি দিয়েছিল অ্যাপোলো-১৪। এটি ছিল তৃতীয় মনুষ্যবাহী চন্দ্রাভিযান। পূর্ববর্তী মিশন অ্যাপোলা-১৩ এর ফলো অন মিশন ছিল অ্যাপোলো-১৪। এই অভিযানে মহাকাশচারীরা চাঁদের পাথর ও মাটি সংগ্রহ করেছিলেন ও ছবি তুলেছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই অভিযানে চাঁদের বুকে টেনিসও খেলেছিলেন তারা। এই মিশনের কমান্ডার ক্যাপ্টেন ছিলেন অ্যালান বারলেটলেট শেপার্ড জুনিয়র (ইউএসএন), কমান্ড মডিউল পাইলট ছিলেন মেজর স্টুয়ার্ট রুসা (ইউএসএএফ) এবং লুনার মডিউল পাইলট ছিলেন কুন্ডার এডগার ডিন মিচেল (ইউএসএন)। নাসা এর আগে চাঁদে সফল দুটি অভিযান শেষ করলেও এই মিশনে বেশ কিছু সমস্যায় পড়েছিল। অ্যাপোলো-১৪ চাঁদে যাওয়ার পথে অক্সিজেন ট্যাঙ্ক বিস্টেম্ফারণে কমান্ড সার্ভিস মডিউলকে (সিএসএম) বিকল করে দিয়েছিল এবং তিনজন নভোচারী লাইফবোট হিসেবে লুনার মডিউল (এলএম) ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মিশনটি সফল না হলে হয়তোবা এটিই হতো নাসার অ্যাপোলো মিশনের শেষ পর্ব। লুনার মডিউল পাইলট ডিন মিচেল (ইউএসএন) বলেছিলেন, আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, যদি আমাদের মিশন ব্যর্থ হয়, যদি আমাদের ফিরে যেতে হয়, সম্ভবত এখানেই অ্যাপোলো প্রোগ্রামের সমাপ্তি হবে। নাসা টানা দুটি ব্যর্থতা কাটিয়ে দাঁড়াবে এমন কোনো উপায় ছিল না। মিশনের এমন ত্রুটির ব্যাপারটি স্পেস এজেন্সি এবং অ্যাপোলো-১৪ এর ক্রুদের ওপরও প্রচুর চাপ ফেলেছিল। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা ছাড়াও বেশ কিছু ঘটনার সাক্ষী অ্যাপোলো-১৪।

এই মিশনের কমান্ডার ক্যাপ্টেন অ্যালান বারলেটলেট শেপার্ড জুনিয়র (ইউএসএন) চাঁদে পা রাখা সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি। ১৯৫৯ সালের মার্কুরি-সেভেন মিশনের নির্বাচিত মূল নভোচারীর একজন ছিলেন অ্যালান শেপার্ড। প্রথম আমেরিকান ব্যক্তি হিসেবে তিনি ১৯৬১ সালের ৫ মে মার্কুরি-৩ মিশনে মহাকাশে গিয়েছিলেন কিন্তু রেডস্টোন রকেট সাব-অরবিটালে লঞ্চ করার পর দুর্ভাগ্যক্রমে তার ম্যানিয়ের ডিজিজ নামক কানের ব্যাধি দেখা দিলে তাকে দ্রুত গ্রাউন্ড করানো হয়েছিল। পরে কানে অস্ত্রোপচারের পর তিনি ৪৭ বছর বয়সে অ্যাপোলো-১৪ মিশনে সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি হয়ে চাঁদের বুকে পা রেখে রেকর্ড গড়েন।

চাঁদে অবতরণের পর শেপার্ড এবং মিচেল এক্সট্রা ভিহিকুলার অ্যাক্টিভিটিস (ইভিএ) সম্পন্ন করতে দুই দফায় ৯ ঘণ্টা ২২ মিনিট ৩১ সেকেন্ড চন্দ্রপৃষ্ঠে ছিলেন। প্রথম ইভিএতে ক্যামেরা, যোগাযোগ অ্যান্টেনা স্থাপন, চাঁদের মাটির নমুনা সংগ্রহ, ছবি তোলা এবং অ্যাপোলো লুনার সারফেস এক্সপেরিমেন্টস প্যাকেজ (এএলএসইপি) রাখতে একটানা ৪ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট কাজ করেছিলেন। এরপর আন্টারসে ফিরে খাদ্য এবং বিশ্রাম নিয়ে নভোচারীরা তাদের দ্বিতীয় এবং চূড়ান্ত ইভিএ শুরু করেছিলেন। ৪ ঘণ্টা ৩৪ মিনিটের এই চূড়ান্ত ট্র্যাকটিতে শেপার্ড এবং মিচেল মডিউলার ইকুপমেন্ট ট্রান্সপোর্টার (এমইটি) নামে একটি ভাঁজ গাড়িতে তাদের গিয়ার টানেন। আর আন্টারসে ফিরে আসার আগে শেপার্ড চন্দ্রপৃষ্ঠে এক জোড়া গলফ বল ছোড়েন যা ৫০ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করে এবং সেটিই পৃথিবীর বাইরে প্রথম কোনো খেলার ঘটনা। অবশ্য তার এই রেকর্ডটি মিচেল ভেঙে দিয়েছিলেন কয়েক সেকেন্ড পরই, মিচেল আরেকটি সরঞ্জামের হ্যান্ডেল নিয়ে একটি জাভিলিনের মতো ছুড়ে মারে, যা শেপার্ডের বলের চেয়ে কিছুটা দূরে চলে যায়। নাসার এ অভিযানে চন্দ্রযানটি লুনার অরবিটে ২.৮ দিন অবস্থান করে মোট ৩৪ বার চাঁদকে প্রদিক্ষণ করে। গবেষণার জন্য ৯৪.৩৫ পাউন্ড বা ৪২.৮০ কেজি চাঁদের মাটি নিয়ে ৯ দিন ১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের মিশন শেষে ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে পৃথিবীর বুকে সফলভাবে অবতরণ করে। অ্যাপোলো-১৪ মিশনের দলনেতা অ্যালান শেপার্ড চাঁদের বুকে গলফও খেলেছিলেন, আর তাই সেই হিসাবে চাঁদের বুকে গলফ খেলারও ৫০ বছর পূর্ণ হলো।

বিষয় : চন্দ্রাভিযান চাঁদে অবতরণ

মন্তব্য করুন