বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটারদের প্রতি বিজেপির অনিহা ছিল ব্যাপক। এই ভোটে গেরুয়া শিবিরে শোচনীয় হারের পেছনে অন্যতম কারণ হিসাবে এটাই চিহ্নিত হয়েছে।

মেরুকরণের রাজনীতি করতে গিয়ে মুসলিম ভোট ব্যাংককে দূরে সরিয়ে রাখার ইচ্ছা ছিল বিজেপির। নবান্ন দখলের লড়াইয়ে জয় লাভ করার যে মানসিকতা কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছিল তা আখেরে লাভ দিয়েছে তৃণমূলকে। সিপিএম-কংগ্রেস জোটকে করছে নিশ্চিহ্ন। আর বিজেপিকে ক্ষমতার মসনদ থেকে শত যোজন দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এমনটাই অভিযোগ উঠেছে। ৩০ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোটারদের বাদ দিয়ে বিজেপির বঙ্গ বিজয় অসম্ভব বলেই দাবি করছেন গেরুয়া শিবিরের থাকা সংখ্যালঘু নেতারা।

মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক ধারাবাহিকভাবেই ২০১৬-র বিধানসভা ভোট থেকে বিজেপির পক্ষে আসেনি। বিশেষ করে শতাংশের হারে উল্লেখ্যযোগ্যভাবে। ২০১৬ সালের বিধানসভায় মুসলিম ভোট তৃণমূল পেয়েছিল ৫১ শতাংশ, বিজেপি ৬ শতাংশ। ২০১৯ সালের লোকসভায় তৃণমূল পেয়েছিল ৭০ শতাংশ, বিজেপি ৪ শতাংশ। এবার ২০২১ এর বিধানসভা তৃণমূল পেয়েছে ৭৫ শতাংশ এবং বিজেপি পেয়েছে ৭ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক ক্রমাগত শতাংশের হারে বেড়েছে। অপরদিকে, বিজেপির মুসলিম ভোট ২০১৬ এর বিধানসভার তুলনায় ২০২১এর বিধানসভা ভোটে ১ শতাংশ বেড়েছে,আবার ২০১৯ এর লোকসভার তুলনায় মাত্র ২ শতাংশ ভোট বেড়েছে ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে।

ইতিমধ্যেই বিজেপির অভ্যন্তরে এনিয়ে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, এবিষয়ে দলের সংখ্যালঘু নেতারা প্রকাশ্যে কেউই মুখ না খুললেও ভিতরে সকলেই ফুঁসছেন। এমনটাই জানা গেছে। এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চার সহ সভাপতি কাশেম আলি ও কবিরুল ইসলাম দল ছেড়ে তৃণমূলের পথে। এই দুই নেতা অভিযোগ করেছেন, বিজেপিতে থেকে সংখ্যালঘুদের জন্য কাজ করা অসম্ভব। তাই তাঁরা একা নন, মুসলিম সম্প্রদায়ের দলত্যাগীরা প্রায় প্রত্যেকেই তৃণমূলে ফেরার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন।

বিজেপির সাবেক রাজ্য সহ সভাপতি বাদশা আলমের অভিযোগ,‘ সংখ্যালঘুদের এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ভালো হবে না। বিজেপি এবারের বিধানসভা ভোটে পুরোনা কর্মীদের পাশাপাশি মুসলমানদেরও বর্জন করেছিল। তাঁরা মনে করেছিল ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটের কোনও প্রয়োজন নেই, তাঁদের জিতবার জন্য। প্রচার করা হয়েছিল ২০০-ও বেশি আসন পাবেই। ২০০ টির বেশি বিধানসভার আসন পেতে গেলে ২০০-ও মধ্যে ২০০ পেতে হয়। কারণ ২৯২ টা আসনের মধ্যে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট বাদ দিলে ১০০ টা বাদ চলে যায়। বাকি থাকে ২০০ আসন। এই ২০০-ও মধ্যে ২০০ আসন জিতলেই বিজেপি যা প্রচার করেছে তা মিলে যেত। তা কিন্তু হয়নি।’

কেন বিজেপি মুসলিম ভোট পেল না? এ প্রশ্নের উত্তরে বাদশা আলম স্পষ্ট বলেন,‘ এবার যেভাবে মুসলমানদের ভয় দেখানো হলো আমরা এনআরসি, সিএএ করব। এবং তা বিজেপি এবং তৃণমূল পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার করল ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশকারিদের তাড়ানোর বদলে মনে হল ভারতীয় মুসলমানদের তাড়ানো হবে। দেশছাড়া করা হবে। এটা মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করল। বিজেপি আমাদের সর্বনাশ করবে তারা মনে করলেন। আপনি ভারতীয় আইনে বিদেশে গোমাংস রপ্তানির ব্যবসা করতে পারবেন। আর পশ্চিমবঙ্গে প্রচার করা হল বিজেপি এলে গোমাংস নিষিদ্ধ হবে। প্রচার হয়েছে, বিজেপি মুসলমানদের দেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করবে। মুসলমানদের খারাপগুলো প্রচার করব, ভালোটা করব না? মমতাকে যেভাবে ‘বেগম’ বলা হলো,এটা সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।’

অভিযোগের সুরে প্রবীন এই নেতা আরও বলেন,‘ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি নেতারা আর কেন্দ্রীয় নেতাদের একাংশের মুসলিম বিরোধী প্রচার আমাদের ডোবালো। শীতলকুচির ঘটনা নিয়ে আমাদের নেতাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করা হল। বিজেপি সংখ্যালঘুকর্মী এবং প্রার্থীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছিল। আমি জানি বালিগঞ্জে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বস্তিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের মুসলিম কর্মীরা ভোটের কাজ করেন। অন্যকর্মীরা আর্থীক সাহায্য পেলেও সংখ্যালঘু কর্মীরা কিছুই পাননি। বরঞ্চ বলে দেওয়া হয়েছিল, মুসলিম এলাকায় প্রচারে কোনও টাকা দেওয়া যাবে না। পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র এটা হয়েছে। এসব নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে মুসলিম কর্মীদের মধ্যে। এটা কোন ষড়যন্ত্র? বিজেপিকে পিছনে দলের ভিতর থেকেই ছুরি মারা হয়েছে। কেন এই ছেলেখেলা হলো আমাদের নিয়ে, এর জবাব চাইছি আমি নেতাদের কাছে। আমাদের বিজেপিতে কোনও অধিকার নেই। একজন হিন্দু বিজেপি কর্মীর থেকে মুসলমান বিজেপি কর্মীর জীবনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কারণ  জঙ্গিরা মানতেই পারে না, মুসলমানরা বিজেপি করবে। যারা করবে তারা বেঈমান। এ বিষয়ে দল কোনও দিন নজর দেয়নি। মোদ্দা কথা, মুসলিম ভোট বিজেপির পক্ষে না আসার জন্য দলের ভিতরেই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। আর একারণেই বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় আসেনি।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে বাদশা আলম বলেন,‘ এবার ভোটে আমার মতো পুরানোদের ব্যবহার করা হয়নি। আমায় সাধারণ কর্মীরা ডেকে নিয়ে গিয়েছেন রাজ্যের সর্বত্র বক্তব্য রাখার জন্য। দলের রাজ্যকমিটির যে বক্তার তালিকা করা হয়েছিল, তাতে আমায় রাখা হয় নি। আমার অপরাধ কি? বাম আন্দোলন ছেড়ে বহুদিন আগে আমি দলে এসেছিলাম। তখন দলের কঠিন সময়। লোকসভার প্রার্থীও হয়েছিলাম।’

বাদশা আলম আরও বলেন,‘ভোটে মুসলমান বিরোধী প্রচার হল, অথচ মুসলমানদের জন্য মোদিজীর সরকার কী করেছেন তা বলা হলো না। মাদ্রাসায় মাতৃভাষা শিক্ষাদানের কথার মতো বিষয়গুলো বলা হলো না। মুসলমানরা বিজেপির থেকে সম্মান পাবে তা না বলে উলটে তাঁদের ভয় দেখানো হলো! ফলে কোন সাহসে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা বিজেপিকে ভোট দেবে? বাজপেয়ীজি বা তপন শিকদারের সময় বিজেপি সমন্ধে মুসলিমদের এই ধারণা ছিল না। মুসলমানরা যদি না চাইত তাহলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যুক্ত বাংলার মন্ত্রী হতে পারতেন না। কবি নজরুল,কবি জসিমউদ্দিন শ্যামাপ্রসাদের গুণগ্রাহী ছিলেন। হিন্দুরা মুসলিম বিদ্বেষী নন। এসব প্রচার করা হলে ভোটের ফলাফল অন্যরকম হতো। মুসলমানরা হিন্দু বিদ্বেষী এই নীতি থেকে আমাদের সরে আসতে হবে,যদি সত্যিই আমরা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে চাই।’