করোনা সংকট মোকাবিলায় মাঠে নেমেছে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। বৈশ্বিক এই মহামারির প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই দুর্গত ও কর্মহীন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বামপন্থি রাজনৈতিক জোট ও দলগুলোও। নেতারা বলছেন, জনকল্যাণমুখী অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো তারাও করোনার প্রথম থেকেই মানুষের পাশে রয়েছেন। তবে প্রকৃত অর্থে তাদের সামর্থ্য তুলনামূলক কম। এরপরও তাদের ভাষায় 'সীমিত সামর্থ্য' নিয়েই সাধ্যমতো অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন তারা। করোনার সংক্রমণ থেকে দেশ ও দেশের মানুষ পুরোপুরি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

গত বছরের মার্চে দেশে প্রথম করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। মাঝে স্তিমিত হলেও এখন ডেলটা ভেরিয়্যান্টের সংক্রমণ ও তাতে মৃত্যুর হারও বেড়েই চলেছে। দ্বিতীয় ঢেউ পার হয়ে তৃতীয় ঢেউ চলছে। করোনা সংকট যেমন বেড়েছে, তেমনি কাজ ও জীবিকা হারিয়ে কোটি মানুষ অসহায় ও দুর্গত হয়ে পড়েছে। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও দুর্গত ও অসহায় মানুষের পাশে রয়েছে প্রথম থেকেই। বাম দলগুলোও এক্ষেত্রে কমবেশি সক্রিয় রয়েছে। বামপন্থিদের প্রধানতম জোট বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দলগুলো জোটগত অথবা দলীয়ভাবে করোনাকালীন ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। জোটের অন্যতম প্রধান শরিক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) উদ্যোগে করোনার শুরু থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্কসহ করোনা প্রতিরোধসামগ্রী তৈরি ও বিতরণ করা হয়েছে। দুস্থ ও অসহায় পরিবারকে খাদ্য সহায়তা, ফুডকোর্ট স্থাপন করে রান্না করা খাবার সরবরাহ, দলের চিকিৎসক প্যানেলের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা টেলিফোনে সেবা প্রদান এবং অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করে সেবা প্রদানের কার্যক্রমও চালানো হয়েছে। সিপিবির 'কভিড-১৯ রেসপন্স টিম' আলাদা করোনা তহবিল গঠন করে ত্রাণ ও সেবা কার্যক্রম চালাচ্ছে। দেশের প্রতিটি জেলায় 'কন্ট্রোল রুম' প্রতিষ্ঠা করেও ত্রাণ তহবিল সংগ্রহ ও মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রচারপত্র বিলির মাধ্যমে বিশেষ করে বস্তির শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসিক এলাকাগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালায় সিপিবি। দলের গণসংগঠন যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর পক্ষেও সারাদেশে এমন কার্যক্রম চালানো হয়।

সিপিবি নেতারা জানিয়েছেন, করোনার শুরুতে গঠিত 'কভিড-১৯ রেসপন্স টিম'-এর কার্যক্রম বর্তমানে কিছুটা সীমিত হয়ে এলেও এখনও কমবেশি অব্যাহত রয়েছে। আর পুরো কার্যক্রম আরও সুসমন্বিত করতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে পাঁচ সদস্যের আলাদা 'কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল' গঠন করা হয়েছে। এই সেলের আওতায় সারাদেশের নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের খাদ্য সহায়তা প্রদান, চিকিৎসাসেবা, করোনার ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশনে মানুষকে সহযোগিতা ও সবার জন্য বিনামূল্যে ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে জেলায় জেলায় 'ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশন ক্যাম্প' স্থাপন এবং মানুষের সচেতনতা তৈরির কার্যক্রমগুলো চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া করোনাকালে সরকার ঘোষিত বিভিন্ন আর্থিক সহযোগিতা ও প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হওয়া সারাদেশের কর্মহীন ও শ্রমজীবী মানুষের তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্নিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যাতে সরকারি আর্থিক সহযোগিতা ও প্রণোদনা পান- সেটি নিশ্চিত করা হবে।

সিপিবি গঠিত 'কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল' ও 'কভিড-১৯ রেসপন্স টিমে'র সমন্বয়ক এবং দলের সহসাধারণ সম্পাদক কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন সমকালকে বলেছেন, করোনার শুরু থেকেই মানুষের পাশে থেকে এসব কার্যক্রম চালাচ্ছেন তারা। এর বাইরেও দলের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেখানে যার যেটুকু সামর্থ্য রয়েছে- সেটা নিয়েই নেতাকর্মীরা অসহায় মানুষকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করছেন।

বাম জোটের আরেক প্রধান শরিক বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলও (বাসদ) করোনার শুরু থেকে দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ ও খাদ্য বিতরণ, চিকিৎসাসেবা, অক্সিজেন সরবরাহ ও টিকা রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম এবং গরিব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে 'অদম্য পাঠশালা' চালুসহ নানা ধরনের কার্যক্রম নিয়ে মানুষের পাশে রয়েছে। রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে 'কমিউনিটি কিচেন'-এর মাধ্যমে কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার সরবরাহ কার্যক্রম চালু করে প্রশংসা কুড়িয়েছে দলটি। জয়পুরহাট ও নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় প্রতিদিনই ত্রাণ ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। নাটোর, কুষ্টিয়া, ভেড়ামারা, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় 'অক্সিজেন ব্যাংক' স্থাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া টিকাদানের অনীহা দূর করে মানুষকে করোনার টিকা গ্রহণে উৎসাহী ও সচেতন করতে দেশজুড়ে বিশেষ প্রচারণা ও টিকা রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম চালাচ্ছে বাসদ। এর আওতায় আগামী ৭ আগস্ট থেকে সরকার ঘোষিত ইউনিয়ন পর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলে এ বিষয়ে সচেতন করা ও মানুষকে টিকাদান কার্যক্রমে নিয়ে যাওয়ার বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হবে।

গণসংহতি আন্দোলন ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাম জোটের অন্য শরিক দলগুলোও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দুস্থ ও অসহায় মানুষের মধ্যে কমবেশি ত্রাণ ও খাদ্য বিতরণ, চিকিৎসাসেবা ইত্যাদি তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। বাম জোটের বাইরে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য এবং বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টসহ বিভিন্ন জোটের শরিক বামপন্থি দলগুলোও জোটগত অথবা দলগতভাবে ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্ট জোট ও দলের নেতারা।

এ প্রসঙ্গে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, করোনার এই দুর্যোগে সাধ্যমতো মানুষের পাশে রয়েছেন তারা। যেখানে বাম দল ও জোটের শক্তি বেশি, সেখানে বেশি এবং যেখানে শক্তি একটু কম সেখানে কম সহযোগিতা করতে পারছেন তারা। এরপরও তারা কিন্তু বসে নেই। তিনি বলেন, বাম দলগুলোর সামর্থ্য এমনিতেই একটু কম। এ কারণে মানুষের কাছ থেকে নিয়ে, সেটি আবার মানুষকেই সহযোগিতার কাজে ব্যয় করেন তারা। আর এখানে চুরি-চামারির কোনো বিষয় না থাকায় এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় হওয়ায় মানুষও বিশ্বাস করে তাদের সহযোগিতা করেন। দেশ-বিদেশের সচ্ছল ও বিত্তবান মানুষের পাশাপাশি শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান বজলুর রশীদ ফিরোজ।