খিলগাঁও, চৌধুরীপাড়া, রামপুরা, বাড্ডা- নানা জায়গায় তার পৈতৃক ভূসম্পত্তি। বলেন, আমার দাদার দাদার। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।

কুড়ি শতকের গোড়ায় এমনকি দেশ ভাগের পরেও ঢাকায় জনস্রোত ক্ষীণধারায় পুরান ঢাকার (তাও অঞ্চলবিশেষে) বাসিন্দা ছাড়া কেউ কুট্টি নন। কথায় কুট্টির টান নেই, বচনও বাংলা-উর্দু-আরবি-ফার্সি মিশিয়ে নয়। বাংলাদেশের বাকি জেলার আঞ্চলিক ভাষার মতোই সরল। সিলেট বা দক্ষিণবঙ্গের ভাষা সবটা বুঝি না। দেখতে হয় বাংলা একাডেমির আঞ্চলিক ভাষার অভিধান।

মনে আছে, ঢাকা দর্শন ১৯৬২ সালের গোড়ায়। থাকতুম বেচারাম দেউড়িতে, কুট্টিভরা চারদিক। ওয়ারী-র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে তখনকার ধনীদের বাস। কিছু পুরানা পল্টন, সেগুনবাগিচা, সিদ্ধেশ্বরী, শান্তিনগরে। মতিঝিল মাথাচাড়া দিচ্ছে।

অগ্রজ রশীদ হায়দার ঢাকা-ভ্রমণে বেরুলেন এক রবিবারে। সঙ্গে আছি। রিকশায় সোয়ারি। সিদ্ধেশ্বরী পর্যন্ত এসে অগ্রজের কথা : 'ঢাকা শেষ'। দেখলুম মগবাজার-ইস্কাটন-মালিবাগ-রাজারবাগের রাস্তায় ইট-সুরকি ফেলা হচ্ছে। অর্ধেকও শেষ হয়নি। মালিবাগ-গুলবাগের রাস্তাও আধকাঁচা পথ। নিউমার্কেটের অনেক পরে মালিবাগ-সিদ্ধেশ্বরীর মৌচাক মার্কেট ঢাকা শহরে দ্বিতীয় বিপণিবিতান। দ্রষ্টব্য। ওখানে একটি ময়রার দোকান ছিল। আমরা জিলিপি খেলুম। দেখলুম বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলাকীর্ণ। ছোট-ছোট নৌকোও চোখে পড়ে। কিছুটা উর্বর ভূমিতে রেললাইন।

একবার মাছ মারতেও গিয়েছি। জলে কাছিম, সাপও। লুতফর রহমান বীনুর বাবার মুখে শুনেছি জলাভূমিতে আমাদেরও জমি ছিল! এখন যে ঘরবাড়ির পত্তন, আমাদের জমিতেই। বীনুর বাপ-দাদা লেখাপড়ার চেয়ে জমিজমা দেখভালেই অধিকতর ব্যস্ত। অর্থ, চাল-ডাল, গরু-ছাগল, মাছ বিক্রি, দুধ যথেষ্ট, দরকার হয়নি বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়।- এ কথা বীনুরই রসিকতাচ্ছলে। বীনুই ওই বংশে (বাবা-মায়ের) কনিষ্ঠ সন্তান। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন। বাবা-মা, বড় ভাই, বড় বোনের গর্ব।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে আমরা বীনুদের বাড়িতেই ভাড়া থাকতুম। খিলগাঁওয়ে। আনসার হেডকোয়ার্টারের বিপরীতে। দোতলা বাড়ি। দুটি ঘর। প্রশস্ত ছাদ। ছাদে বিকেলে-সন্ধেয় জাহিদ (হায়দার), আবু সাঈদ জুবেরী, আহমদ বশীর, বীনুর (লুতফর রহমান) আড্ডা। ওরা সমবয়সী, সহপাঠী।

এই বাড়িতেই আনিসা হায়দার-রশীদ হায়দারের দ্বিতীয় কন্যা ক্ষমার (শাওন্তী হায়দার, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণসংযোগ বিভাগে অধ্যাপিকা) জন্ম। এবং এই বাড়িতে বহু নামি কবি-ঔপন্যাসিক গিয়েছেন। সরদার জয়েনউদ্দিন, রশীদ করিম, শামসুর রাহমান প্রমুখ। রাজনীতিকও। যথা- জাসদের শিরীন আখতার। অন্য দলের আরও কয়েকজন।

কে এই লুতফর রহমান বীনু? তাকে নিয়ে কেন লিখছি? লেখার দায় কেন? মতাদর্শে তার সঙ্গে অমিল। বিস্তর ফারাক। হতেই পারে। মতান্তরে হলেও মনান্তর হয়নি কখনও। তিনি অনুজতুল্য। সম্বোধন করতেন 'খোকন ভাই'। বন্ধুকুলে ঘোষণা : 'আমার খোকন ভাই'। বয়সে বড় ছিলুম।

লুতফর রহমান বীনু, বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান। বাবার কাছে আবদার-অনুরোধ করে (ওর বাবা নাকি বলতেন, ওর মুখেই শোনা, মৃত্যুর মাসখানেক ফোনে বলছিলেন, 'ছাওয়াল গরু-ছাগলের ছবি তুলবে। কী হবে ছবি তুলে? ভাত খাওয়ার টাকা আমাকেই দিতে হবে।' আব্বা-মা-ভাইবোনের ছবি প্রথম তুলি। প্রিন্ট করে দেই। আম্মা বলেন, আমাদের কোনো ছবি নেই, বাঁধিয়ে রাখবো) শখের 'ক্যামেরা' কেনেন। নবম কি দশম শ্রেণিতে পড়াকালীনই (স্বপন, জাহিদ হায়দার ঠিকঠাক বলতে পারবেন) ছবি তুলতে প্রবল উৎসাহী। নানা ধরনের ছবি। মিছিল, জনসভা, নেতা-নেত্রীর। বীনু ফোনে বলছিলেন :'১৯৭৩ সাল থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দুই সপ্তাহ আগেও যত ছবি তুলেছি, নন-প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার হিসেবে আর কেউ তুলেছেন কিনা অজানা। সব ছবি আওয়ামী লীগকে দিয়েছি। বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার হয়েও। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতার জনক। তার জন্যই বাংলাদেশ পেয়েছি। এই কৃতজ্ঞতা মনেপ্রাণে। অকৃতজ্ঞ হতে পারি না। বেগম জিয়ার ফটোগ্রাফার, এটা চাকরি। তবে স্বীকার করি, বিএনপিতে ঝুঁকেছি জীবিকার কারণেই।'

বীনুর খেদ, অভিমান : 'আমি মুক্তিযোদ্ধা। সম্মুখসমরে লড়েছি। নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, রাইসুল ইসলাম আসাদ, স্বপন (জাহিদ হায়দার), জুবেরী (আবু সাঈদ জুবেরী) সহযোদ্ধা। প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকাও। জীবিতদের জিজ্ঞেস করলে বিস্তারিত বলবে। আমি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট চেয়ে দুইবার দরখাস্ত করেছি, উত্তরও পাইনি। আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় হয়তো ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে। আমার গায়ে বিএনপির গন্ধ, এই অজুহাতে। বিএনপির কিছু নেতা বেগম জিয়ার কানে গুঁজে দেন আওয়ামী লীগের নেতা আমার বন্ধু, সুসম্পর্ক। তাদেরও ছবি তুলি। বঙ্গবন্ধুর ছবি ধ্বংস না করে আওয়ামী লীগের হাতে পৌঁছে দিয়েছি। এই অপরাধে বেগম জিয়া আমাকে বরবাদ করেন।'

বীনু ফোন করলে ঘণ্টাধিক কথা। কথক বীনুই। অতীত স্মৃতিচারণায় প্রগলভ। বাধা দিই না। শুনতেও ভালো লাগে। বলেন, মুক্তিযুদ্ধে সরাসারি যোগ দেওয়ার আগে জিয়াউর রহমানের নামই শুনিনি। জিয়াউর রহমানের জন্য মুক্তিযুদ্ধে যাইনি। প্রেরণা বঙ্গবন্ধু। তার জন্যই স্বাধীনতা যুদ্ধে। আমরা 'জেড ফোর্সে' ঠাঁই পেয়েছি। পেয়ে জানলাম, ফোর্সের হেড জিয়াউর রহমান। তাকে যুদ্ধের সময় একবারও দেখিনি। খোকা ভাই (সাদেক হোসেন খোকা) একদিন বলেন, 'চট্টগ্রাম থেকে একজন মেজর এসেছেন, তার নাম জিয়াউর রহমান। আমরা তার ফোর্সে। তিনি কমান্ডার। লোকটা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোদ্ধা হলে আপত্তি নেই।'

বীনুর আরও কথা : 'জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের একজনের মুখেও শুনিনি। স্বাধীনতার পরে স্যারের (জিয়াউর রহমান) সঙ্গে দুইবার দেখা, তার ছবি তোলার কারণেই, কথাও হয় কিছু। কিন্তু ভুলেও বলেননি, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। বিএনপির আমলে প্রচারণা। একবার প্রতিবাদ করে তিরস্কৃত, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া বলেন, 'তুমি বেশি কথা বলো। চুপ।'

বীনুর সঙ্গে গল্পে ফোনে নানা স্মৃতি উদ্ভাসিত। 'খোকন ভাই, আপনার যৌবনের খিলগাঁও, চৌধুরীপাড়া, রামপুরা, হাজিপাড়া আর নেই। চিনতেই পারবেন না। আমরাই পারি না।' মালিবাগ বাজারে আবুল মিয়ার গোস্তের দোকান থেকে গরু, ছাগলের মাংস কিনতেন বারো আনা, চৌদ্দ আনা সের, তার থেকে দুই আনা মারতেন। বারো আনা হলে বলাকায়, গুলিস্তানে ছবি দেখতে যেতেন, এক টাকা জমলে বই কিনতেন। রাত জেগে পড়তেন।

বীনুর ঘরেই মাঝে-মাঝে থাকতুম। কবিতাও লিখতুম। বীনুর দাবি : '"জন্মই আমার আজন্ম পাপ' এবং বিতর্কিত 'কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়' আমার ঘরেই লিখেছিলেন। রাত জেগে।"

বীনু আমাদের পরিবারের বিস্তর ছবি তুলেছেন। সবার সঙ্গে মায়ের ছবি। দাদুভাই (রশীদ হায়দার), ঝরা ভাবি (আনিসা হায়দার, রশীদ হায়দারের স্ত্রী)। ওদের দুই কন্যা হেমা (হেমন্তী হায়দার), ক্ষমা (শাওন্তী হায়দার)। এসব ছবি অতীত জলসায়। জাগ্রত। বীনুর কাছে কৃতজ্ঞ।

বীনুর ছেলে অস্ট্রেলিয়ায়, মেয়ে নিউইয়র্কে। মেয়ে কবিতা লেখে, ইংরেজি ভাষায়। বই প্রকাশিত। 'আপনাকে পাঠাতে বলবো, পড়ে জানাবেন ওকে। আপনার সার্টিফিকেট পেলে খুশি হবে।'

বীনুর অস্থিমজ্জায় তারুণ্য, 'আপনি আসুন, মৌলবাদীরা কী করবে? আমরা ফাইট করবো। জান দেবো।'

দৈনিক সংবাদে ফটোগ্রাফার, যোগ দিয়ে কলকাতায় টেলিফোন :'খোকন ভাই, সম্পাদক বজলুর রহমান বলেছেন, তুমি খেঁটেখুঁটে কাজ করো, আমরা আনন্দিত।'

বীনু আমাদের পারিবারিক। হোক বিএনপির মতাদর্শের। আত্মিকবলয়ে কী করে বিচ্ছিন্ন করি? বিচ্ছিন্নতায় দেশকালের সময়কাল, ইতিহাস, রাজনীতিও বিচ্ছিন্ন হয়।

বীনুর মৃত্যুতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোকবার্তায় যাই বলুন, বীনুর মনমানসিকতা ঠিকঠাক অজানা। আওয়ামী লীগেরও। এখানেই রাজনৈতিক দৈন্য। সংঘাত। বীনুর অবদান বিস্মরণ, আওয়ামী লীগ সরকারের জন্যও অগণতন্ত্র।

কবি