লকডাউন নামে পরিচিতি পাওয়া বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর গতকাল বুধবার প্রথম দিনে সড়কে গাড়ি ও মানুষের ভিড় বেড়েছে। সড়কে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন যোগ হওয়াই বাড়তি ভিড়ের কারণ। ট্রেন, লঞ্চও চলছে। সরকারি অফিস, শপিংমল, বিপণিবিতান পুরোদমে খুলেছে। সর্বত্র কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানার শর্তে বিধিনিষেধ উঠলেও এ ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বড় ধরনের ঘাটতি।
করোনা সংক্রমণ রোধে ঈদের জন্য মাঝে আট দিন বিরতি দিয়ে ১ জুলাই থেকে ৩৩ দিন 'কঠোরতম' লকডাউন ছিল। তবে সপ্তাহখানেক ধরে এর প্রভাব খুব একটা দেখা যায়নি। অনুমতি না থাকলেও দোকানপাট ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করেছিল। ফলে গতকাল লকডাউন উঠে যাওয়ার পর জনজীবনে তাই খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। তবে ২১ দিন পর খোলায় গ্রাহকসেবা দেওয়া সরকারি অফিসগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়।
রাজধানীর ধানমন্ডি, সায়েন্স ল্যাব, শাহবাগ, বাংলামটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী হয়ে কালশী, মিরপুর, আগারগাঁও এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রাইভেট গাড়ি, পণ্যবাহী যানবাহনসহ অন্যান্য গাড়ি আগের মতোই চলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা। তাতেই রাজধানী স্বাভাবিক সময়ের চেহারা ফিরে পেয়েছে। সড়কে যানজট আর যাত্রীদের অপেক্ষা দুটিই দেখা গেছে।
বাস সব আসনে যাত্রী নিয়ে আগের ভাড়ায় চলায় স্বস্তিতে সাধারণ যাত্রীরা। লুৎফর রহমান নামে এক যাত্রী জানিয়েছেন, লকডাউনের ফাঁকে এপ্রিল থেকে মাঝেমধ্যে বাস চললেও ৫০ টাকার ভাড়া ৮০ টাকা হয়েছিল। বুধবার থেকে ৫০ টাকা ভাড়ায় চলতে পারায় খরচ কমেছে।
বাস বন্ধ থাকলেও কলকারখানা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খোলা থাকায় কর্মীরা ছিলেন বিপাকে। একদিকে ছিল যান সংকটের ভোগান্তি, অন্যদিকে রিকশা, মোটরসাইকেলসহ যেসব যানবাহন বিকল্প, তাতে ভাড়া ছিল দুই থেকে তিন গুণ। লকডাউন উঠে যাওয়ায় তা থেকে রক্ষা পেয়েছেন যাত্রীরা। জিগাতলার বাসিন্দা রায়হান কবির জানালেন, লকডাউনে প্রতিদিন বাসা থেকে খিলক্ষেতের অফিসে রিকশায় যাওয়া-আসায় তিনশ টাকা লাগছিল। মোটরসাইকেলেও একই রকম খরচ হচ্ছিল। বাস চালু হওয়ায় ৬০ টাকায় যাতায়াত করছেন।
লকডাউন উঠে যাওয়ায় খুশি দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকা বাস ও অটোরিকশার চালক-শ্রমিকরা। চিটাগং রোড থেকে বছিলা রুটের বাস 'রজনীগন্ধা'র হেলপার মো. শামীম জানালেন, এপ্রিল থেকে গত চার মাসের মধ্যে ৭০ দিনই বাস বন্ধ ছিল। দিনে তার কম করে হলেও ৪০০ টাকা আয় হয়। লকডাউনে অন্তত ২৮ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে তার। ঘর ভাড়া বাকি পড়েছে। লকডাউন উঠে যাওয়ায় অন্তত খাওয়া-পরার দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে।
গতকাল বিকেল ৫টার দিকে মিরপুরের ১০ নম্বর মোড়ে দেখা যায় যানজট। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সার্জেন্ট নিজামুল হক জানালেন, বুধবার সকাল থেকেই গাড়ির চাপ রয়েছে। দুপুরে চাপ কিছুটা কম থাকলেও বিকেলে ফের বেড়েছে। তবে গাড়ির চাপ করোনার আগের সময়ের তুলনায় কিছুটা কম।
মিরপুর থেকে তেজগাঁও আসতে পথে বিজয় সরণি মোড়ে দেখা যায় চিরচেনা গাড়ির সেই দীর্ঘ সারি। ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে শত শত মানুষকে বাসে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। লকডাউন উঠে যাওয়ায় সব আসনেই যাত্রী পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। চালকরা জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশে অর্ধেক বাস বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। আবার অনেক দিন বসে থাকায় প্রচুরসংখ্যক বাসের মেরামত প্রয়োজন। সেগুলোও প্রথম দিনে রাস্তায় নামেনি। তাই যান সংকট রয়েছে। এ কারণে অনেক বাস নিয়ম না মেনে দাঁড়িয়ে যাত্রী নিয়েছে।
মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক হলেও চালক, শ্রমিক, যাত্রীদের তা মানতে দেখা যায়নি। ফার্মগেট এলাকায় 'বিহঙ্গ' পরিবহনের বাসে দেখা যায় আসন পূর্ণ হওয়ার পরও সাত-আটজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে। আসাদ গেটে একই চিত্র দেখা যায় 'প্রজাপতি' পরিবহনের বাসে। সাত-আটজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে। অধিকাংশ যাত্রী ঠিকঠাক মাস্ক পরা ছিল না। বাসটির চালক আমিনুল মিয়া বললেন, দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা জোর করেই উঠেছেন। আর যাত্রীরা মাস্ক না পরলে তার কী করার আছে!
১৯ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল ট্রেনও চালু হয়েছে। সারাদেশে ১০২টি আন্তঃনগর ট্রেনের ৩৮টি চালু হয়েছে প্রথম দিনে। ২৬০টি মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেনের মধ্যে ২০টি চালু হয়েছে। গতকাল কমলাপুর স্টেশনে দেখা গেছে, ভিড় তেমন নেই। স্টেশন-সংশ্নিষ্টরা জানালেন, ক'দিন আগেই ঈদ শেষ হয়েছে। আবার অর্ধেকের বেশি ট্রেন এখনও বন্ধ। তাই যাত্রীর চাপ এখনও কম। তবে স্টেশনে লকডাউনের দিনগুলোর মতো স্বাস্থ্যবিধি মানতে কড়াকড়ি নেই। দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা নিষিদ্ধ হলেও তা তোলা হচ্ছে। তবে স্টেশন ম্যানেজার মাসুদ সারোয়ার বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ট্রেন ছাড়া হচ্ছে।
ঈদের পরদিন বন্ধ হওয়া শপিংমল, বিপণিবিতান খুললেও গতকাল খুব বেশি ক্রেতা দেখা যায়নি। ফুটপাতের দোকানে ভিড় বেশি ছিল। মিরপুর-১০ নম্বরের ফুটপাতে শিশুদের জামাকাপড়ের দোকানের সামনে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। বিক্রেতা মো. রাজু বললেন, ২১ দিন পর দোকান খুলেছেন। সকালে, দুপুরে ক্রেতা ছিল না। বিকেলে বিক্রি কিছুটা বেড়েছে।