সিরাজগঞ্জে বন্যার প্রকোপ শুরু হয়েছে। উজানের পানি বাড়ায় গত দু'সপ্তাহে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক তাঁতি, কৃষক ও সাধারণ মানুষ। লকডাউনে জেলার ছোটবড় লক্ষাধিক তাঁত বন্ধ থাকায় এমনিতেই বেকার ছিলেন প্রায় সাত লাখ তাঁতি। লকডাউন শেষে কারখানা খুললেও সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলায় বন্যার কারণে নতুন করে বন্ধ রয়েছে অর্ধলাখ তাঁত। ফলে এ পেশার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জীবন-জীবিকা নিয়ে এখন কষ্টে আছেন তারা।

সদরের কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলী ও বাঐতারা গ্রামে রোববার গিয়ে তাঁতিদের নিদারুণ দুর্ভোগ দেখা যায়। সদরের মুলিবাড়ী-বিয়াড়া আঞ্চলিক সড়কের পূর্বদিকে সরকারি শিল্পপার্কের দক্ষিণে যমুনা পাড়ের ছাতিয়ানতলী ও বাঐতারা গ্রাম দুটি এখন পানিতে নিমজ্জিত। ছাতিয়ানতলী বাজারসহ গুটিকয়েক উঁচু স্থানে কিছু কিছু তাঁত চালু থাকলেও বেশিরভাগই বন্ধ। তাঁত সমৃদ্ধ দুই গ্রামের পাঁচ সহস্রাধিক তাঁতি পরিবার এখন প্রায় বেকার।

বাঐতারা গ্রামের তাঁত মালিক আমির চান বলেন, লকডাউনের পর আমার দশটি হ্যান্ডলুম চালু হলেও বন্যার কারণে গত দু'সপ্তাহ থেকে বন্ধ রয়েছে। আট মাস আগে তিন জোড়া মোটা সুতার শাড়ি এক হাজার চারশ টাকায় বিক্রি হতো। সুতার দাম বাড়ায় এখন তা একশ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি হলেও শাড়িপ্রতি পঞ্চাশ টাকা ক্ষতি হচ্ছে।

একই গ্রামের তাঁত মালিক দীন মোহাম্মদ বলেন, করোনায় সাধারণ তাঁতিদের অবস্থা বর্তমানে খুবই দুর্বিষহ। তাঁত শিল্পের প্রধান উপকরণ মোটা ৫০ কাউন্টের সুতা গত আট মাসে একশ পাউন্ড প্রতি ছয় থেকে সাত হাজার টাকা বেড়েছে। ছাতিয়ানতলী গ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক চিত্তরঞ্জন পাল, তাঁত মালিক আব্দুল বাছেদ, হামিদুল ইসলাম, হাসান আলী, ফরিদুল ইসলাম, এরশাদ আলী ও তাঁত শ্রমিক সুরমান আলী বলেন, তাঁত সমৃদ্ধ তাদের গ্রামটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে পড়ায় প্রতি বছরই প্লাবিত হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু হানিফ জানান, বন্যায় জেলার ৯ উপজেলার ৭৪টি ইউনিয়নের সাত হাজার ৩০০ হেক্টর জমির বোনা আমন, রোপা আমন, সবজি, আখ, কলা ও বীজতলার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম জানান, বন্যায় সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। অধিকাংশই নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। এবারের বন্যায় আলাদা করে তাঁতিদের কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ গতকাল দুপুরে সমকালকে বলেন, যমুনার পানি কমতে শুরু করেছে। তাঁতিদের জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকলেও ছাতিয়ানতলী ও বাঐতারা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দিতে সদর ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হবে। নিজ নিজ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত তাঁতিরাও নিজ নিজ উপজেলায় ইউএনওর কাছে আবেদন করতে পারেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনার পানি বিপৎসীমার ৫২ সেন্টিমিটার ওপরে থাকলেও ২৪ ঘণ্টায় ৮ সেন্টিমিটার কমেছে। এই পানি কমা অব্যাহত থাকবে বলেও জানা গেছে।