সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) মানব জাতির জন্য অনুপম আদর্শ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন :'রাসুলে পাকের (সা.) জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।' তার তাকওয়া, অনুপম ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র-মাধুর্য সবার জন্য অনুসরণযোগ্য।
শিশু-কিশোরদের মন খুবই সহজ-সরল, কোমল ও পবিত্র। মহানবী (সা.) শিশুদের মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। শিশুদের সঙ্গে সব সময় ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাদানের কথা উল্লেখ করে রাসুল (সা.) ঘোষণা করেন, 'তোমরা শিশুসন্তানদের স্নেহ করো, তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করো এবং সদাচরণ ও শিষ্টাচার শিক্ষা দাও' (তিরমিজি)। রাসুল (সা.) মানবসন্তানকে সুশিক্ষা প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'সন্তানকে সদাচার শিক্ষা দেওয়া দান-খয়রাতের চেয়েও উত্তম' (মুসলিম)।
শিশুর মানসিক বিকাশে রাসুল (সা.) তাদের সঙ্গে কোমল ব্যবহার নিজে করেছেন, অন্যদেরও সদাচার করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি চাইতেন শিশুরা যেন কোনো সময় কষ্ট না পায় বা নির্যাতনের শিকার না হয়। রাসুল (সা.) ঘোষণা করেন, 'যে ছোটকে স্নেহ-মমতা করে না এবং বড়কে শ্রদ্ধা করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়' (বুখারি)।
শিশুদের মধ্যে নবীজির প্রভাব ছিল অন্য রকম। এর কারণ হচ্ছে, রাসুল (সা.) কখনও শিশুদের ওপর রাগ করতেন না। কর্কশ ভাষায় তাদের সঙ্গে কথা বলতেন না। ছোটদের দেখলে আনন্দে নবীজির বুক ভরে যেত। একদিন একটি শিশুকে দেখে তিনি জড়িয়ে ধরে বললেন, 'এই শিশুরাই আল্লাহর বাগানের ফুল।'
একদিন রাসুল (সা.) খেতে বসলেন। কিন্তু খানা তখনও শুরু করেননি। উম্মে কায়েস বিনতে মুহসিন (রা.) তার শিশুপুত্রকে কোলে করে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। শিশুটিকে দেখে রাসুল (সা.) তার দিকে এগিয়ে এলেন। পরম আদরে কোলে তুলে নিয়ে খাবারের জায়গায় গিয়ে বসলেন। শিশুটি নবীজির আদর পেয়ে কোলে প্রস্রাব করে ভিজিয়ে দিল। এ ঘটনায় নবীজি মুচকি হাসলেন। তার চেহারায় বিরক্তি প্রকাশ পেল না। তিনি পানি আনার জন্য একজনকে বললেন। পানি আনা হলে যে যে জায়গায় প্রস্রাব পড়েছিল, সেখানে ঢেলে দিলেন। রাসুল (সা.) মনে করতেন, 'বাগানের ফুল যেমনি পবিত্র, মায়ের কোল থেকে নেওয়া শিশুও তেমনি পবিত্র।'
হজরত আনাস (রা.) বলেন, 'আমি রাসুলের (সা.) চেয়ে আর কাউকেও সন্তানের প্রতি এত অধিক স্নেহ-ভালোবাসা প্রকাশ করতে দেখিনি।' তিনি প্রাণপ্রিয় কন্যা হজরত ফাতেমাকে (রা.) খুবই স্নেহ করে প্রায়ই বলতেন, 'ফাতেমা আমার কলিজার টুকরা।' শিশু ফাতেমা (রা.) যখন নবীজির কাছে যেতেন, তিনি উঠে দাঁড়াতেন এবং ফাতেমার হাত ধরে চুমু দিয়ে তাকে মজলিসে বসাতেন (আবু দাউদ)। তিনি বলতেন, 'সন্তান-সন্ততিকে সম্মান করো এবং তাদের উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দাও' (ইবনে মাজা)।
একবার মসজিদে খুতবা দেওয়ার সময় হজরত ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইন (রা.) লাল জামা পরিধান করে নানার দিকে এগিয়ে এলেন। রাসুল (সা.) তাদের দেখে খুতবা স্থগিত রেখে কোলে তুলে সামনে এনে বসিয়ে তারপর খুতবা শুরু করলেন। তিনি অন্য শিশুদেরও খুব ভালোবাসতেন, তাদের কোলে তুলে নিতেন; সুন্দর নামে ডাকতেন।
শিশুদের কোমল ও পবিত্র মনে যদি একবার কোনো খারাপ ধারণা বা ভয়ভীতি প্রবেশ করে, তবে তা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে থেকে যায়। তাই রাসুল (সা.) শিশু-কিশোরদের সঙ্গে খেলাচ্ছলেও মিথ্যা বা প্রতারণা করতে নিষেধ করেছেন। শিশুদের প্রতি মহানবীর (সা.) স্নেহ ও পিতৃসুলভ আচরণের কথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।
মহানবী (সা.) আমাদের বাস্তবে শিখিয়ে গেছেন কীভাবে শিশুদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু অনেক অভিভাবক শিশুদের সঙ্গে কোমল আচরণ করেন না, তাদের কথাও মনোযোগ দিয়ে শোনেন না। শুধু হুঁ-হ্যাঁ করে যান। এমন আচরণ করলে শিশুরা কষ্ট পায়। আর এটা ইসলামী আদর্শেরও পরিপন্থি। তাই রাসুলের (সা.) আদর্শ অনুসরণ করে শিশুদের প্রতি আরও আন্তরিক ও স্নেহশীল হতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।
বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি