তাইওয়ানের ভূখণ্ডে শান্তি নষ্ট করে এমন কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বলে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান। 

চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ইয়াং জিচির সঙ্গে বৈঠকের পর জেক সুলিভান বলেন, ‘পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। আমরা প্রকাশ্য ও গোপনীয় বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছি।

তাইওয়ানকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সেনা মোতায়েন করবে কি না বিবিসির এমন প্রশ্নে সুলিভান বলেন, ‘এমন দিন যেন আমাদের দেখতে না হয়, সেজন্য করণীয় সব কিছুই করব। আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিস্কার করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তার মিত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছে, এটি আমাদের দায়িত্ব। পরিস্কারভাবে বলতে চাই, আমাদের মিত্রদের স্বার্থ সুরক্ষায় আমরা সবসময়ই তা করব।’

তাইওয়ান অভিযোগ করেছে, গত ১ অক্টোবর চীনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে যুদ্ধবিমান প্রদর্শনীর নানা পর্যায়ে তাইওয়ানের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ছে  চীনের বিমানবাহিনীর বোমারু বিমান। 

এই বিমানগুলোর মধ্যে পারমাণবিক বোমারু বিমান, ফাইটার জেট ও সাবমেরিন বিধ্বংসী বিমানও ছিল।

গত ৫ অক্টোবর তাইওয়ান জানায়, চীনের বিমানবাহিনীর ৫৬টি যুদ্ধবিমান তাইওয়ানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছ। এর আগে একসঙ্গে এত বিমান তাইওয়ানের আকাশে দেখা যায়নি।

এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে চীনের সঙ্গে দুর্ঘটনাক্রমে সংঘাত বেধে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চিউ কুয়ো- চেং। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উত্তেজনা গত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করে সতর্ক করেন তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার অঞ্চলটি সফরে গেছেন ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন প্রতিনিধি। তাদের সঙ্গে সাক্ষাতে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট তাসাই ইন-ওয়েন এ আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিষয়ে আলোচনা করেন। সমমনা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করারও আগ্রহ দেখান তিনি।

চীনের কাছে তাইওয়ান তাদের আরেকটি প্রদেশ মাত্র, যার ওপর চীনের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়। কিন্তু তাইওয়ান সেটা মনে করে না। তাইওয়ানে একটি রাজনৈতিক পক্ষ আছে (কেএমটি), যারা চায় চীনের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণ। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) তাইওয়ানকে চীন থেকে পৃথক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার পক্ষে।

তাইওয়ানকে নিজেদের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রদেশ বলে মনে করে চীন। অন্যদিকে, তাইওয়ান দাবি করে তারা স্বাধীন, সার্বভৌম। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা ‘অনিবার্য’ বলে মনে করেন এবং এ লক্ষ্যে তিনি দ্বীপটিকে নানা দিক থেকেই চাপে রাখছেন।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই-ইং-ওয়েন বলেছেন, চীনের কাছে তাইওয়ানের পতন হলে এশিয়ায় শান্তির পরিবেশের জন্য তা বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনবে। 

গত মঙ্গলবার ‘ফরেইন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সাই এই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তাইওয়ান হুমকিগ্রস্ত হলে নিজেদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই নেবে। তাইওয়ান কোনও সামরিক সংঘাত চায় না বরং চীনের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ সহাবস্থান চায়। কিন্তু তাইওয়ানের গণতন্ত্র এবং জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়লে তারা আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করবে। তাইওয়ানের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়লে জনগণ জেগে উঠবে।

সাই-ইং-ওয়েন তাইওয়ানকে ‘এক চীন নীতি’র আওতাধীন মানতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে চীন তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে মনে করে। তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের আলোচনাও বন্ধ রয়েছে। সাই তাইওয়ানকে ‘স্বাধীন দেশ’ বলে আসছেন এবং ‘রিপাবলিক অব চায়না’ কেবল তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক নাম বলে দাবি করে আসছেন।

চীনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই। তবে তা সমতার ভিত্তিতে এবং রাজনৈতিক কোনও শর্ত ছাড়া হওয়ার দাবি করেছেন তিনি। বেইজিং বরাবরই এমন শর্তাধীন আলোচনা নাকচ করে আসছে।

চীনা যুদ্ধবিমানের বারবারই তাইওয়ানের আকাশসীমা লঙ্ঘনের বিষয়টি উল্লেখ করে সাই লিখেছেন, পিপলস লিবারেশন আর্মির প্রায় প্রতিদিনের অনুপ্রবেশের মধ্যেও চীন-তাইওয়ান সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থানের নড়চড় হবে না: তাইওয়ান চাপের কাছে মাথা নত করবে না।