কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীরা। জমি পরিচর্যা ছাড়াও উৎপাদনের প্রায় সব পর্যায়েই এখন নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। বাড়ছে উৎপাদনশীলতাও। তবে কৃষি খাতে তাদের এই অবদান মূল্যায়ন পাচ্ছে না। কারণ বাজার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ পুরো মাত্রায় রয়েছে পুরুষের হাতে, যা নারীর ক্ষমতায়নের পথে একটি বিরাট অন্তরায়।

বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আমজাদের সঙ্গে বিয়ে হয় ফাহিমার। কিছুদিন পর স্বামী চাকরি হারালে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে ফাহিমা সবজি চাষের পরিকল্পনা করেন। সবজি চাষে কিছুদিন পরই বদলে গেছে তার ভাগ্য। চলতি মৌসুমে (২০২০-২১ অর্থবছরে) ফাহিমা ৭৫ শতক জমিতে লাউ, বেগুন, মুলা, টমেটো, মিষ্টিকুমড়া, ক্ষিরা, বাঁধাকপি, মরিচ, বরবটি, করলা, পুঁইশাক, শাকসবজি উৎপাদন করেছেন। মোট সবজি উৎপাদন করেছেন ৪৯ মণ, যা গত বছরের মোট উৎপাদনের তুলনায় দ্বিগুণ। নিজের আয়ের টাকা দিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়ানো ছাড়াও কিনেছেন দশ শতাংশ জমি। এ ছাড়া একটি দুধেল গাভি ও দেশি মুরগি লালনপালন করছেন। তারপরও সামাজিকভাবে কৃষাণির স্বীকৃতি মেলেনি ফাহিমার।

মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদককে ফাহিমা বেগম বলেন, 'কত কষ্ট যে জীবনে করেছি! সবকিছুর পরে সবজি চাষ করে সফল হয়েছি। তবু এ সমাজ স্বীকৃতি দেয় না। স্বামীর নামেই দোকান বরাদ্দ নিতে হয়।' 

নরসিংদীর জাভেদ কলা চাষ করে লোকসানের সম্মুখীন হলে তার স্ত্রী আয়েশা স্বামীর সহযোগিতায় নার্সারির ব্যবসা শুরু করেন। বাড়ির আঙিনাজুড়ে নার্সারি হওয়ায় সংসারের কাজের পাশাপাশি নার্সারির কাজ করেন আয়েশা। এখন তারা স্বাবলম্বী। এই উদ্যোগ আয়েশার হলেও এ সফলতার পেছনে একক কৃতিত্ব এখন স্বামী জাভেদেরই।

শুধু ফাহিমা কিংবা আয়েশা নন, অধিকাংশ গ্রামীণ নারীর শ্রমই এভাবে বিনা পারিশ্রমিকের ঘর-গৃহস্থালির কাজের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। গ্রামীণ নারীরা কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে শস্য উৎপাদন, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন, সবজি ও মৎস্য চাষ, বনায়ন ইত্যাদি কাজে পুরুষের পাশাপাশি সমান অবদান রেখে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কর্মজীবী নারীর হিসাব মতে, কৃষি খাতের ২০টি কাজের মধ্যে ১৭টি কাজে নারীরা অংশগ্রহণ করেন। তার পরও কৃষিঋণ ও কৃষকের জন্য দেওয়া সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে নারীরা বঞ্চিত।

'গ্রামীণ জীবনযাত্রায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচার অভিযান'-এর ২০১২ সালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের মোট নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ ১ কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী। যার ৬৮ শতাংশ কৃষি, পোলট্রি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামীণ ৪১ শতাংশ নারী আলু চাষের সঙ্গে জড়িত। ৪৮ শতাংশ মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক শাহানা হুদা রঞ্জনা জানান, নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্যতম একটি অর্জন হচ্ছে গ্রামীণ নারীর বহুমাত্রিক ভূমিকা ও অবদানের স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া। কারণ তাদের কাজের এই স্বীকৃতি গ্রাম উন্নয়নের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে।

নারীপক্ষ'র সদস্য সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারী কীভাবে অংশগ্রহণ করছে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ পারিবারিক ক্ষেত্রে নারীর শ্রম অস্বীকৃত। নারীকে বাদ দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রগতি সম্ভব নয়।

এ অবস্থার মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- 'সবার জন্য ভালো খাদ্য চাষ করেন গ্রামীণ নারী'। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও উন্নয়ন সংস্থা।