বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির লাগাম টেনে বিশ্বকে নানামুখী হুমকি থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে আজ থেকে শুরু হচ্ছে কপ২৬ জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন। জাতিসংঘের উদ্যোগে যুক্তরাজ্যের আয়োজনে ১২০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং মোট দুই শতাধিক দেশের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নিচ্ছেন। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ ও এর প্রভাব মোকাবিলায় সম্মেলন থেকে একটি চূড়ান্ত রোডম্যাপে পৌঁছানোর আশা করছে জাতিসংঘ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যের মাটিতে বৈশ্বিক পর্যায়ে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক আয়োজন কপ২৬ সম্মেলন। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্রমেই বিপর্যয়ের মুখে থাকা বিশ্বকে বাঁচানোর শেষ সুযোগ হিসেবে এ সম্মেলনকে দেখছেন অনেকে। বিজ্ঞানীরা বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার লক্ষ্য অর্জনে হাতে আছে মাত্র এক দশক। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, এ পরিস্থিতি মানবজাতির জন্য একটি লাল সতর্কবার্তা। এ ছাড়া পরিবেশবাদী বৈশ্বিক সংগঠন ওশান রেবেলিয়ন ও এক্সটিংশন রেবেলিয়ন মনে করছে, বিশ্বকে রক্ষার এটিই শেষ সুযোগ।

কপ২৬ সম্মেলন ঘিরে ধরিত্রী বাঁচানোর দাবিতে গ্লাসগোসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন বিশ্বের পরিবেশবাদী সংগঠনের কর্মীরা। বনাঞ্চল, সমুদ্র ও জলাশয় রক্ষা, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করাসহ বিভিন্ন দাবিতে প্রতিদিন কর্মসূচি পালন করছেন তারা। গতকাল শনিবার লন্ডনে এ ধরনের একটি কর্মসূচিতে অংশ নেন সাড়া-জাগানো পরিবেশকর্মী গ্রেটা টুনবার্গ। সম্মেলন নিয়ে বেশি আশাবাদী না হলেও টুনবার্গও মনে করেন, এটিই শেষ সুযোগ।

আজ থেকে ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবেন যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী অলোক শর্মা। তিনি বলেছেন, কপ২৬ সম্মেলন ব্যর্থ হলে তা হবে বিশ্বের জন্য মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ। এ ছাড়া বলার কিছুই নেই। সবাই দেখছে, প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে কী হচ্ছে। গত বছর ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর এবং গত দশক ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ দশক।

মানুষ যে উন্নতি আর সমৃদ্ধির কথা বলে, তার প্রত্যক্ষ ফল হলো জলবায়ু পরিবর্তন। মানুষের কর্মকাণ্ড বদলে দিচ্ছে প্রকৃতিকে। বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা; বদলে যাচ্ছে জলবায়ু। এতে মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই হুমকির মুখে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবীর তাপমাত্রা এতটা বেড়ে যাবে যে মানুষের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।

একদিকে বাড়বে খরা, অন্যদিকে বরফ গলে উঁচু হতে থাকবে সমুদ্রপৃষ্ঠ। তাতে তলিয়ে যাবে বাংলাদেশের বিশাল এলাকাসহ বিশ্বের বহু নিম্নাঞ্চল। চরম আবহাওয়াই হয়ে উঠবে স্বাভাবিক নিয়ম। শুধু মানুষ নয়, এই পৃথিবীর বহু প্রাণের জন্যই নেমে আসবে বিপর্যয়। কপ২৬ সম্মেলনে এই বিপর্যয় থেকে রক্ষার একটি পরিস্কার রোডম্যাপ ও তা অর্জনে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

জলবায়ু সম্মেলনের শুরুর দিনে শেষ হচ্ছে ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সংগঠন জি২০ শীর্ষ সম্মেলন। এ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ অনেকে অংশ নিয়েছেন। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাবে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে জনসন বলেছেন, কপ২৬ সম্মেলন ব্যর্থ হলে বিশ্বজুড়ে অভিবাসন, খাদ্য ও খাবার পানির সংকট মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছাবে। কার্বন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবাইকে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো অনেক প্রত্যাশা নিয়ে কপ২৬ সম্মেলনে যাচ্ছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে (নেট জিরো) নামিয়ে আনতে বড় উদ্যোগ নেবে উন্নত দেশগুলো। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রথম লক্ষ্যই হচ্ছে এটি। সে লক্ষ্য অর্জনে অনেক পিছিয়ে আছে বিশ্ব। তবে এবারের সম্মেলনে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ আদায় করতে জোর ভূমিকা রাখবে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো।

যেসব লক্ষ্যে পৌঁছানোর টার্গেট: এবারের সম্মেলন থেকে সুনির্দিষ্ট কতগুলো লক্ষ্যে পৌঁছানোর টার্গেট নিয়েছে জাতিসংঘ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ২০০ দেশের কাছ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি (এনডিসি) আদায়। এরই মধ্যে শতাধিক দেশ তাদের পরিকল্পনাপত্র জাতিসংঘে জমা দিয়েছে। তবে বিশ্বের শীর্ষ কার্বন নির্গমনকারী দেশ চীন বলছে, ২০৫০ নয়; তারা ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনবে। বিশ্বের তৃতীয় কার্বন নির্গমনকারী দেশ ভারত এ ব্যাপারে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট সময় জানায়নি। অথচ চীন ও ভারত বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কয়লা ব্যবহারকারী দেশ। এসব দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদিত। ফলে এই দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ছাড়া ২০৫০ সালের মধ্যে কীভাবে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা যাবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কারণ, এখন পর্যন্ত ২০০টির মধ্যে মাত্র ১১১টি দেশ জাতিসংঘের কাছে তাদের কার্বন হ্রাসের প্রতিশ্রুতি-সংবলিত এনডিসি জমা দিয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি লক্ষ্যমাত্রাও পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে তিনি বলেছেন, কার্বন হ্রাসের এই লক্ষ্য অন্তত সাত গুণ বাড়াতে হবে। এসব বিষয়ে বিশ্বনেতারা সম্মেলনে আলোচনা করবেন।

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে দায়ী প্রধান দেশগুলো এখন পর্যন্ত এনডিসি জমা দেয়নি। ফলে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সম্মেলনজুড়ে সবার দৃষ্টি থাকবে ভারত ও চীনের সিদ্ধান্তের ওপর। এরই মধ্যে এ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। কারণ, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্মেলনে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না। তিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন। অস্ট্রেলিয়াও স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা দেয়নি। এ ছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোও এবারের সম্মেলনে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না।

এবারের জলবায়ু সম্মেলনে নেট জিরো লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো আরেকটি টার্গেট। ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ করে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ। তা করতে না পারলে ২১০০ সাল নাগাদ বিশ্বের তাপমাত্রা প্রাকশিল্প যুগের চেয়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বা তারও বেশি বেড়ে যেতে পারে পরিবেশবিজ্ঞানীরা বারবার হুঁশিয়ারি করেছেন।

এবারের সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত অর্থায়ন আদায়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় কোপেনহেগেন সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২০২৩ সালের মধ্যে পুরো অর্থ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে ২০২১ সাল পার হতে চললেও সেই অর্থ পায়নি বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো। এসব দেশ এই সম্মেলনে ধনী দেশগুলোর দেওয়া ওই প্রতিশ্রুতি আদায়ে লড়াই করবে।