ইথিওপিয়ার টিগ্রে অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে গণহত্যা, গণধর্ষণ ও জরুরি ত্রাণ বিতরণের বাধা দেওয়ার মতো গুরুতর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এসেছে দেশটির সেনাবাহিনী ও টিগ্রে প্রদেশের স্বাধীনতাকামী টিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের(টিপিএলএফ) বিরুদ্ধে। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন ও ইথিওপিয়ার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের যৌথ তদন্ত কমিটির এই প্রতিবেদনে টিগ্রেতে আশ্রয় নেওয়া এরিত্রিয়ান শরণার্থীদের মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন ও গণহত্যার কথা সবিস্তারে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। 

ইথিওপিয়ার যুদ্ধাপরাধ প্রতিবেদনটি বুধবার কোনো এক সময় প্রকাশ করা হবে বলে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে রয়টার্স।

চলতি বছর মার্চে ইথিওপিয়ার যুদ্ধাপরাধ নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান মিচেল ব্যাচেলেট যুদ্ধাপরাধ তদন্তে যৌথ কমিটির প্রস্তাবে সম্মত হন। তিনি তখন বলেছেন, এই অঞ্চলে মারাত্মক যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত হয়েছে।

এদিকে এই প্রতিবেদন অস্বীকার করেছে ইথিওপিয়া সরকার। 

জরুরি ত্রাণ সরবরাহের বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইথিওপিয়া সরকার। তাদের দাবি, ইথিওপিয়ার সেনারা যুদ্ধ চলাকালে যেকোনো নিগ্রহ ঠেকাতে কাজ করেছে। 

এরিত্রিয়ার নিয়ন্ত্রন নেওয়া টিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) দাবি করেছে, এই অভিযোগ মিথ্যা। 

তারা বলছে, যুদ্ধ চলাকালে ‘কোনো একটি গ্রুপ’ এস নিগ্রহের ঘটনা ঘটাতে পারে। কিন্তু টিপিএলএফ সদস্যরা কোনো নিপীড়ন করেননি।

টিপিএলএলের মুখপাত্র গেতাচিউ রেদার অভিযোগ,  তদন্ত কমিটি টিগ্রের মাই কাদ্রা ও এক্সম অঞ্চলে সফর করেননি যেখানে সবচেয়ে বেশি গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে। 

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটি আমাদের অন্ধকারে রেখেছে। তাছাড়া এই প্রতিবেদনে যুদ্ধের সব পক্ষকে যুক্ত না করায় পূর্ণাঙ্গ তথ্য উঠে আসবে না, যা আদতে হবে একটি ভুল প্রতিবেদন।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রতিবেদনের ফলাফল কোনো আইনি ভিত্তি তৈরি করতে পারবে কি না তা এখনও পরিস্কার নয়। কারণ ইথিওপিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয়। তাই যুদ্ধাপরাধ বিচারে আদালতের কোনো এখতিয়ার নেই।

যুদ্ধ চলছে বছরের পর বছর 

ইথিওপিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হতে সেপ্টেম্বর ১৯৬১ সাল থেকে মে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত লড়াই করে এরিত্রিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। ইতালির ঔপনেবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পরে ১৯৪৭ সালে এরিত্রিয়া স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ইথিওপিয়ার রাজা শাসন দাবি করে। 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের হস্তক্ষেপে এরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার সঙ্গে প্রথমে একটি ফেডারেশন, পরবর্তীতে সাংবিধানিক স্টেট হিসাবে থাকে। তবে এরিত্রিয়া স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ১৯৬১ সালে ফেডারেশন বাতিল করে এরিত্রিয়াকে একীভূত করে নেয় ইথিওপিয়া।

এরপর থেকেই এরিত্রিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠী স্বাধীনতার আন্দোলন চালাতে থাকে। সে সময় স্নায়ু যুদ্ধের বিভিন্ন পক্ষ ইথিওপিয়া-এরিত্রিয়াকে সহায়তা করে। 

অবশেষে ১৯৯১ সালের মে মাসে ইথিওপিয়ার বাহিনীকে পরাজিত করে এরিত্রিয়ার ইপিএলএফ মুক্তিযোদ্ধারা। একমাস পরেও ইপিএলএফ বাহিনীর সহায়তায় ইথিওপিয়ান পিপলস রেভ্যুলশনারি ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট আদ্দিস আবার দখল করে নেয়।

১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে একটি গণভোট হয়, যেখানে এরিত্রিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে ভোট পড়ে। সেই বছরেই এরিত্রিয়া স্বাধীন হয়।এরপর ১৯৯৮ সালে দুই দেশের মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। মাত্র দু বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়।

২০০০ সালে দু দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হলেও সীমান্তে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা রয়েই যায়।

২০১৮ সালে  আবি আহমেদ ক্ষমতা নেওয়ার আগ পর্যন্ত কয়েক দশক ধরে ইথিওপিয়ার সেনা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে টিপিএলএফএর কর্তৃত্ব বজায় ছিলো।

২০১৯ সালে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ক্ষমতাসীন জোট ভেঙ্গে দেন এবং একাধিক নৃতাত্বিক গোষ্ঠী ভিত্তিক আঞ্চলিক দল গঠন করেন এবং তাদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন। টিপিএলএফ ঐ দলে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ওই বছর সেপ্টেম্বরে ঐ দ্বন্দ্ব আরো বৃদ্ধি পায় যখন টিগ্রে'তে একটি আঞ্চলিক নির্বাচন হয়। যদিও করোনাভাইরাস মহামারির জন্য সেসময় পুরো দেশে সব ধরণের ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল। আবি সেসময় ভোটকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেন।

টিগ্রের প্রশাসন আবির সংস্কার কার্যক্রমকে নেতিবাচকভাবে দেখে। তারা মনে করে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে বেশি ক্ষমতা দিয়ে আঞ্চলিক রাজ্যগুলোর ক্ষমতা সীমিত করতে চান।

এরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইস আফওয়ের্কির সাথে মি. আবিই'র 'নীতি বহির্ভূত' বন্ধুত্বরও সমালোচক তারা। 

২০১৯ সালে এরিত্রিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার জন্য নোবেল শান্তি পুরষ্কার পাওয়া মি. আবিই মনে করেন টিপিএলএফ তার কর্তৃত্বকে খর্ব করতে চায়।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, টিগ্রে প্রদেশের বিদ্রোহ দমনে তিনি সেনা অভিযান চালাচ্ছেন। 

আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আহ্বান উপেক্ষা করে নোবেলজয়ী প্রধানমন্ত্রী আবি তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের (টিপিএলএফ) বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। 

গত বছর ৯ নভেম্বর রাতে টিগ্রের দক্ষিণ-পশ্চিমের শহর মাই-কারদায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। 

অ্যামনেস্টির আফ্রিকা মহাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের পরিচালক ডেপ্রস মুচেনা জানান, সংঘাতে নিহতদের মধ্যে দিনমজুর রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে সামরিক সংশ্লিষ্টতা নেই।

বছরের পর বছর ধরে চলা এই গৃহযুদ্ধের কারণে দেখা দেওয়া দুর্ভিক্ষে ৪ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন। উত্তর ইরিত্রিয়ায় ২৫ লাখ মানুষকে বাস্ত্যুচুত করেছে এই যুদ্ধ।