নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় অপহরণের পাঁচ দিন পর শুক্রবার সকালে বাড়ির পাশে ডোবা থেকে আট বছরের শিশু ইয়ামিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মুক্তিপণের ১০ লাখ টাকা না পেয়ে অপহরণকারীরা তাকে হত্যা করেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। ২৮ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিল ইয়ামিন।

সে উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের বাখরনগর গ্রামের জামাল মিয়ার ছেলে। তার বাবা জামাল মিয়া মালয়েশিয়ায় প্রবাসী। তিন ভাইবোনের মধ্যে ইয়ামিন দ্বিতীয় ছিল।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিখোঁজের পরদিন থেকে বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে কল দিয়ে শিশুটির পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চায় অপহরণকারী চক্র। এ অবস্থায় পরিবারটি রায়পুরা থানা পুলিশের কাছে যায় এবং গত বুধবার থানায় অভিযোগ করে। এরপর থেকে পুলিশ কাজ শুরু করলেও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। গতকাল বাখরনগর গ্রামের মোতালেব মিয়ার বাড়ির পেছনে একটি ডোবা থেকে গলিত অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ব্যাপারে তার মা শামসুন্নাহার বেগম সমকালকে বলেন, আমার অবুঝ ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমার বুক খালি হয়ে গেছে। ইয়ামিন আর মা বলে ডাকবে না। এ কথা কাকে বোঝাব। আর যে সহ্য করতে পারছি না। যত টাকা লাগে দেব, বাড়িঘর বিক্রি করে হলেও দেব, ছেলেকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে বলেন। বিশ্বাস করি না, ছেলে আর ফিরবে না আমার বুকে।

অপহরণকারীরা ১০ লাখ টাকা দাবি করলেও শামসুন্নাহার তাদের পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা জানান। এতে অপহরণকারীরাও রাজি হয়। পরে শামসুন্নাহার এক লাখ টাকা বিকাশের মাধ্যমে দেন, বাকি টাকা দেবেন বলে জানান।

ইয়ামিন


শিশুটির চাচা মাহমুদুল হাসান জানান, গত রোববার নির্বাচনের দিন দুপুরে শিশুটির মা শামসুন্নাহার ভোট দিতে কেন্দ্রে যান। এরপর বাড়ি ফিরে আর সন্তানকে ঘরে দেখেননি। তার সন্ধান চেয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়। তবে অপহরণকারীরা শামসুন্নাহারের মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে জানায়, 'মাইকিং করিয়ে কোনো লাভ হবে না, আপনার বাচ্চাকে আমরা তুলে এনেছি, আমাদের এক লাখ টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেব।' তখন শিশুটির মা তাদের কাছে ইয়ামিনের ছবি চাইলে তারা মোবাইল ফোনে একটি ছবি পাঠায়। ছবিতে ইয়ামিনকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। পরদিন সকালে তারা আবার ফোন দেয় এবং মুক্তিপণ হিসেবে ১০ লাখ টাকা দাবি করে। অপহরণকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শামসুন্নাহার তার ছেলে তাদের কাছে আছে এমন প্রমাণ চাইলে তারা জানায়, সন্ধ্যার পর বাড়ির দুই কিলোমিটার দূরে একটি ব্রিজে ইয়ামিনের পায়ের জুতা ফেলে রাখা হবে। কথা মতো জুতা ফেলে যায় অপহরণকারীরা।

মাহমুদুল হাসান জানান, পরদিন কল দিলে টাকা নিয়ে রায়পুরা রেলগেটে যেতে বলা হয়। তাদের কথা মতো সেখানে গেলে অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর জানায়, লাইন ক্লিয়ার নেই, পরে জানানো হবে। এরপর নরসিংদীর আরশিনগর এলাকায় যেতে বলা হলে সেখানেও লাইন ক্লিয়ার নেই বলে জানায় এবং টাকার ব্যাগসহ ট্রেনে উঠতে বলে। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় শামসুন্নাহার ট্রেনে উঠে পড়েন। কিছুদূর যাওয়ার পর টাকার ব্যাগ ট্রেন থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে বলে অপহরণকারীরা। বিষয়টি শামসুন্নাহারের কাছে খটকা লাগলে তিনি তা না ফেলে ঘোড়াশাল রেলস্টেশন নেমে বাড়ি ফিরে আসেন এবং বিষয়টি থানা পুলিশকে অবহিত করেন। পরদিন কল দিয়ে ইয়ামিনকে ফেরত নেওয়ার ইচ্ছা আছে কিনা জানতে চায় তারা। পরে টাকা নিয়ে বিকাশ এজেন্টের ঘরে যেতে বলে। তাদের কথা মতো, বিকাশ এজেন্টের কাছে গেলে ওই দোকানের ছবি দেখতে চায় তারা। দোকানের ছবি পাঠানোর পর একটি নম্বর দিয়ে ১০ হাজার টাকা পাঠাতে বলে এবং বাকি টাকা পরে নেওয়ার ব্যবস্থা করবে বলে অপহরণকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এরই মধ্যে রাতে লাশ এনে ফেলে দিয়ে গেছে বাড়ির পাশে। সকালে মানুষ দেখে খবর দেয়। ভাতিজা হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন মাহমুদুল হাসান।

শিশু ইয়ামিনের জানাজা রাত ৮টায় স্থানীয় জামিয়া কাশেমিয়া উলুম মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

রায়পুরা থানার ওসি আজিজুর রহমান বলেন, অপহরণকারীরা মুক্তিপণ হিসেবে ১০ লাখ টাকা দাবি করে আসছিল। এর আগে শিশুটির মা একটি অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি তিনজনকে সন্দেহ করেন বলে জানিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না বলে জানান ওসি।