চটি পায়ে কালো পাড়ের সাদা শাড়ি পরা এ তরুণী প্রতিবাদী উত্তাল জনতার ঘিরে ধরা একটি গাড়ির ওপর উঠে নাচছেন। তার স্লোগানে উদ্দীপ্ত কর্মীরা সমস্বরে বলছেন- ফিরে যাও জেপি। কলকাতার রাস্তায় সেদিনের সেই ঝড় তোলা মেয়েটি রাজনীতির আঁচে পুড়ে খাঁটি নেতা হয়েছেন। আজ তিনি ভারতের শাসন ক্ষমতায় বসার স্বপ্ন দেখলে দোষের কী?

১৯৭৫ সালের ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি জমানার শাসনে ভারত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মমতা তখন কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের নেত্রী। ইন্দিরার শাসনের বিরুদ্ধে কর্মসূচি নিয়ে কলকাতায় আসার চেষ্টা করেন দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী 'লোক নায়ক'খ্যাত জয়প্রকাশ (জেপি) নারায়ণ। তৎকালীন জনতা পার্টির এই নেতার গাড়ি ঘিরে কংগ্রেস কর্মীরা যে বিক্ষোভ করেছিলেন, তার মধ্য থেকে ক্রমে সর্বভারতীয় পর্যায়ে উঠে আসে একটি মুখ- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রয়োজনে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ার এই রাজনীতি তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম তার প্রমাণ।

১৯৭৫ সাল থেকে নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত ১২ জন প্রধানমন্ত্রীর শাসন আমলে কঠিন সব বাঁক বদলে ঠিকই আপন পথ খুঁজে নিয়েছেন মমতা। এমপি, বিধায়ক, মন্ত্রী থেকে হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী। কংগ্রেসের রাজনীতি করেছেন ২৬ বছর। আজ সেই দলটি মমতার নেতৃত্বের উত্থানে কোণঠাসা। বিজেপির জন্যও প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন ভারতের একমাত্র এই নারী মুখ্যমন্ত্রী।

রাজীব গান্ধীর আমল থেকে কংগ্রেসের রাজনীতি হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ২০১৪ সালে মোদি-ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে যায় কংগ্রেস। ২০১৯ সাল ভরাডুবির ষোলোকলা পূর্ণ হয়। এ পর্যন্ত কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয়েছে অন্তত ৭৭টি রাজনৈতিক দল, যার একটি মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। ১৯৯৮ সালে তার হাতে গড়া দলটি পশ্চিমবঙ্গের সীমা পেরিয়ে আসাম, ত্রিপুরা, বিহার, মেঘালয়, গোয়া, হরিয়ানাসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করছে। একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে এসব রাজ্যে ছুটছেন তিনি। সম্প্রতি মেঘালয়ে তৃণমূলের উত্থান মমতা ম্যাজিকের একটি দৃষ্টান্ত। ত্রিপুরার পৌর নির্বাচনেও সাড়া ফেলেছে দলটি। এখন তাদের চোখ গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে। এত সব কর্মযজ্ঞের মধ্যেই বর্তমানে তার দিল্লি-মুম্বাই সফর নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কংগ্রেস দিন দিন ছোটই হচ্ছে। মমতার অভিযোগ, গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুলে মাথাচাড়া দিয়ে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে বিজেপি। যার চূড়ান্ত রূপ মোদি। তবে পশ্চিমবঙ্গে তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা রুখে দিয়ে ভারতবাসীর নজর কেড়েছেন মমতা। এখন না কংগ্রেস, না তাদের জোট-ইউপিএ বিজেপিবিরোধী নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

হিন্দি আর হিন্দুত্ববাদের হাওয়ার বিপরীতে মা, মাটি ও মানুষের কথা বলছেন মমতা। একদিকে অহিংসার বাণী, অন্যদিকে বহুত্ববাদের বার্তা তাকে ভারতের মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তার গৃহীত কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, শিক্ষাঋণের মতো কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি ভারতজুড়ে প্রশংসিত। বিধানসভা নির্বাচনে বড় মুখ নিয়ে আসা মোদি-অমিতরা প্রায় খালি হাতে দিল্লিতে ফিরে যাওয়ার পর মমতাকে নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, এখন দেখা যাচ্ছে তার পূর্ণ প্রকাশ। ফলে সেখানে কংগ্রেস তার কাছে অপাঙ্‌ক্তেয়। রাজ্যভিত্তিক দলগুলোও চাচ্ছে মুখ থুবড়ে পড়া দলটির বাইরে থেকে বিজেপিবিরোধী জোটের নেতৃত্ব আসুক। সময়ের এই চাহিদা পূরণে উপযুক্ত জোগান হিসেবে হাজির হয়েছেন মমতা।

১৯৯৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের আরেকজন মুখ্যমন্ত্রী বামফ্রন্টের কমিউনিস্ট (মার্কসবাদী) নেতা জ্যোতি বসুর নাম বিবেচিত হয়েছিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, কিন্তু পার্টির সিদ্ধান্তে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এখন উঠে আসছেন আরেকজন বাঙালি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদিকে মোকাবিলা করার মতো মুখ কেইবা আছেন? কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী ২০১৪ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনে ব্যর্থ। তবু তিনি কংগ্রেসের ডুবন্ত সূর্যের অলৌকিক উত্থানের মোহে আচ্ছন্ন। ২০১৪ সাল থেকে রাহুলের নেতৃত্বে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ৯৬ শতাংশ আসনে হেরেছে। ছেলের মধ্যে 'রাজনীতির ভীম' জেগে ওঠার অলীক কল্পনায় দিন গুনছেন কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী। তবে রাজনীতির বাস্তবের জমিনে দাঁড়িয়ে মমতা জানান দিচ্ছেন, বিরোধী শিবিরে ঐক্য হলে তার নেতৃত্বেই বিজেপি ও মোদিকে ক্ষমতা থেকে নামানো সম্ভব। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও মমতাকে জোট নেতৃত্ব হিসেবে দেখতে চান।

মমতার ওপর আস্থা রেখে তার পাশে দাঁড়াচ্ছে বিভিন্ন দল ও পেশার মানুষ। সম্প্রতি কংগ্রেস ছেড়ে তার দলে যোগ দিয়েছেন গোয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লুইজিনহো ফেলেইরো ও মেঘালয়ের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমা, সর্বভারতীয় নারী কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সুস্মিতা দেব। জাভেদ আখতার, শাবানা আজমীসহ বলিউডের বহু নামকরা অভিনেতা-অভিনেত্রী মমতার নেতৃত্বকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। ফলে সর্বভারতীয় পর্যায়ে মমতার জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

তবে কংগ্রেস না থাকলে বিরোধী জোট করে বিজেপিকে হারানো যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) নেতা শারদ পাওয়ার। সর্বভারতীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতায় এগিয়ে থাকলেও বয়সের ভার ও পক্ষাঘাতে ব্যাকফুটে চলে গেছেন শারদ। সম্প্রতি মুম্বাইয়ে তার বাসায় গিয়ে জোট গঠন নিয়ে বৈঠক করেন মমতা। মমতাও চান কংগ্রেস জোটে থাকুক। তবে নেতৃত্বের আসনে নয়। শারদও সায় দিয়েছেন।

শুধু শারদ-মমতা নন, কংগ্রেসের সর্বভারতীয় অস্তিত্ব যে মুখ থুবড়ে পড়েছে, তা রাজনীতি সচেতন সবার জানা। ভারতের রাজনীতিতে 'ভোট-কৌশলী' হিসেবে আবির্ভূত হয়ে একের পর এক চমক দেখানো প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, 'কংগ্রেসের নেতৃত্ব একজন ব্যক্তির ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার নয়।' তা ছাড়া বিরোধী জোটের নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই ঠিক করার পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি। রাহুল নন, মমতা-শারদে বেশি আস্থা রাখছেন তিনি। কারণ কী?

মহারাষ্ট্রে ৪৮টি ও পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি মিলে লোকসভায় ৯০টি আসন রয়েছে এ দুই রাজ্যের। এখানে জোট বেঁধে তৃণমূল, শিবসেনা ও এনসিপি লড়াই করবে। আর ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, হরিয়ানার মতো রাজ্যের ১২০-১৪০টি আসনে কংগ্রেস এককভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করে কতটা আসন পাবে, তা নিয়ে ঘোরতর সংশয় রয়েছে। এর কারণ কংগ্রেসের দুর্বল নেতৃত্ব ও বিজেপির হাওয়া।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ১৮৬টি আসনে বিজেপির বিরুদ্ধে এককভাবে লড়াই করে কংগ্রেস জিতেছে মাত্র ১৫টি আসনে, ২০১৪ সালের চেয়ে যা ৯টি কম। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারাও রাহুলের নেতৃত্বে আস্থা হারাচ্ছেন। দলটির প্রবীণ নেতা গোলাম নবী আজাদও সংশয়ে। এই পড়ন্ত দল ও তার নেতৃত্বে জোটের ছাতার নিয়ে দাঁড়াতে চান না মমতা। এই মুহূর্তে তার চেয়ে জুতসই মোদিবিরোধী নেতাও নেই।

শারদ দৌড়ঝাঁপ করার মতো শারীরিক অবস্থায় নেই। কর্ণাটকভিত্তিক জনসমর্থন হারানো জেডি (সেক্যুলার) পার্টির নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেব গৌড়া বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বিহারের এক সময়ের সাড়া জাগানো নেতা নিম্নবর্ণের মানুষের মন জয় করা লালু প্রসাদ যাদব দুর্নীতি মামলায় সাজা খেটে রাজনীতির মাঠে এখন নড়বড়ে। বিহারের আরেক আলোচিত নেতা নীতিশ কুমার বিজেপির আঁচল ধরেছেন। উত্তর প্রদেশের মোলায়ম সিং যাদবের আর সেই জৌলুস নেই। মায়াবতী আছেন দুর্নীতিতে ফেঁসে। অল্প্রব্দ প্রদেশের জগনমোহন রেড্ডির বয়স কম হলেও রাজনীতিতে তার কদর রয়েছে। তবে সর্বভারতীয় চরিত্র নন। তামিলনাড়ূর এমকে স্টালিন তামিল আভিজাত্য রক্ষা ও হিন্দি ঠেকাতে ব্যস্ত। তাদের বিপরীতে মমতা বহুভাষী ও বহু সংস্কৃতির লালনে বেশি বিশ্বাসী। অন্তত ১৪টি ভাষায় কথা বলতে পারেন তিনি। মমতার এই উদারনৈতিক ভাবমূর্তি আগামী লোকসভা নির্বাচনে রক্ষণশীল বিজেপির সূর্য ঢেকে দিতে পারে। তবে তার আগে মমতাকে মেলাতে হবে বেশকিছু যদি-কিন্তুর উত্তর।