ইউক্রেন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা সামরিক মিত্রদের বাদানুবাদ দিনকে দিন বিপজ্জনক দিকে মোড় নিচ্ছে। আর সেই বাদানুবাদের বিস্ফোরণ দেখা গেছে বৃহস্পতিবার সুইডেনে ইউরোপিয় নিরাপত্তা বিষয়ক এক বৈঠকে।

স্টকহোমের বৈঠকে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাবরভ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের পাশে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, রাশিয়া তার ঘরের পাশে ন্যাটো সামরিক জোটের নতুন কোনো তৎপরতা কোনোভাবেই সহ্য করবে না।

লাবরভ সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোট রুশ এই বার্তা অগ্রাহ্য করলে ইউরোপে আবারো যুদ্ধ শুরু হতে পারে। তার মন্তব্য ছিল, ইউরোপকে আবারো যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন দেখতে হতে পারে। খবর বিসিবির।

সুইডেনের বৈঠকে রাশিয়া ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে যার মূল কথা, ন্যাটো জোটকে ইউরোপের পূর্বে নতুন কোনো বিস্তৃতির চেষ্টা বন্ধ করতে হবে।

ব্লিঙ্কেন রাশিয়ার প্রস্তাব বা দাবির ব্যাপারে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। বরং তিনি পাল্টা সতর্ক করেছেন, ইউক্রেনে যে কোনো সামরিক অভিযান চালালে রাশিয়াকে তার 'ভয়াবহ পরিণতি' ভোগ করতে হবে।

২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রাইমিয়া দখল এবং ইউক্রেনের জাতিগত রুশ অধ্যুষিত ডনবাস অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে গত সাত বছর ধরে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা ন্যাটো জোটের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, এই টানাপড়েন দিনকে দিন বিপজ্জনক চেহারা নিচ্ছে।

সুইডেনে বৃহস্পতিবারের বৈঠকটি হয়েছে ইউক্রেন সীমান্তে ৯০ হাজারেরও বেশি রুশ সৈন্য সমাবেশ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে। জানা গেছে, বৈঠকটি বহু-দেশিয় হলেও আলাদাভাবে মুখোমুখি কথা বলেছেন লাবরভ এবং ব্লিঙ্কেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের পরে জানিয়েছেন, দুই পক্ষই ইউক্রেন নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে একমত হয়েছে। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মধ্যে একটি শীর্ষ বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়েও কথা হয়েছে। তবে কবে তা হতে পারে তা নিয়ে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।

তবে জুন মাসে জেনেভায় পুতিন ও বাইডেনের মধ্যে মুখোমুখি যে বৈঠক হয়েছিল সেখানেও ইউক্রেন এবং ন্যাটোর সম্প্রসারণ নিয়ে কথা হয়। কিন্তু তাতে যে কোনো ফল হয়নি তা রাশিয়ার নতুন এই সৈন্য সমাবেশের ঘটনায় স্পষ্ট।

রাশিয়া গত বছরগুলোতে বিভিন্নভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে ইউক্রেনে আমেরিকা বা ন্যাটো জোটের কোনো সামরিক উপস্থিতি তারা মানবে না। সপ্তাহখানেক আগে প্রেসিডেন্ট পুতিন আবারও বলেছেন, আমেরিকাকে এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে হবে।

আর বৃহস্পতিবার স্টকহোমে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাবরভ খোলাখুলি বলেন, ইউক্রেন নিয়ে বিপজ্জনক কোনো পরিস্থিতি এড়ানোর কোনো সদিচ্ছা ন্যাটো দেখাচ্ছে না।

তিনি বলেন, 'ন্যাটো জোটের সামরিক অবকাঠামো রাশিয়ার সীমান্তে নিয়ে আসা হচ্ছে। রোমানিয়া এবং পোল্যান্ডে আমেরিকান ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থা মোতায়েন করা হচ্ছে। আমেরিকার তৈরি মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপে নিয়ে আসা হচ্ছে। যার অর্থ ইউরোপে সামরিক সংঘাতের দুঃস্বপ্ন আবারও ফিরে আসছে।'

লাবরভ হুঁশিয়ার করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা যেন ইউক্রেনসহ রাশিয়ার প্রতিবেশীদের সামরিক 'সংঘাতের চারণভূমি' বানিয়ে না ফেলে।

ইউক্রেনের সরকার এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের সতর্ক করতেই যে সীমান্তে এই সেনা সমাবেশ তা নিয়ে রাশিয়া রাখঢাক করছে না।

ইউক্রেন নিয়ে মস্কোতে গত সপ্তাহে রুশ কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে পুতিন বলেন, 'আমাদের হুঁশিয়ারিতে তারা যে কান দিচ্ছে তার লক্ষণ পরিষ্কার। কারণ তারা উত্তেজিত … পশ্চিমা দেশগুলো যেন রাশিয়ার কথা কানে দেয় তার জন্য উত্তেজনা অব্যাহত রাখতে হবে।'

মস্কোতে গবেষণা সংস্থা আইআইএসির গবেষক অন্দ্রেই কর্তুনভ বলেন, 'ইউক্রেনের সীমান্তে সৈন্য সমাবেশের অর্থ এই নয় যে রাশিয়া সৈন্য ঢুকিয়ে দেবে। পুতিন আসলে একটি বার্তা দিতে চাইছেন। আর বার্তাটি হচ্ছে ইউক্রেনকে সতর্ক করা যে পশ্চিমাদের ভরসায় ডনবাস অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে তারা যেন পা না বাড়ায়।'


অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন ইউক্রেন সীমান্তে ট্যাংক আর সৈন্য পাঠিয়ে মস্কো যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকবার আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে চাইছে। পুতিন ও বাইডেনের সঙ্গে আরেকটি শীর্ষ বৈঠক চাইছে তারা।


কর্তুনভ বলেন, 'জুন মাসের বৈঠকে পুতিন এবং বাইডেন কেউই কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি, কিন্তু ইউক্রেনে সামরিক সাহায্যের ইস্যুতে খুব অল্প হলেও একটি বোঝাপড়া হয়তো সেখানে হয়েছিল।'


বৃহস্পতিবার স্টকহোমের বৈঠকে তেমন একটি শীর্ষ বৈঠক নিয়ে কথা হয়েছে। তবে তার কোনো নিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্র দেয়নি।


মস্কোতে রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাতিয়ানা স্তানোভায়া বলেন, 'পুতিন হয়তো এখনও বিশ্বাস করেন যে তিনি বাইডেনের সঙ্গে একটি বোঝাপড়া করতে পারবেন। কিন্তু তিনি যদি দেখেন তার কোনো আশাই নেই তাহলেই সম্ভাব্য বিপদ। পুতিন তখন এমন পথ নিতে পারেন যা ধারণা করা কঠিন।'