এ বছর বাংলাদেশ ও ভারত তাদের সম্পর্কে অর্ধশতাব্দী পার করছে। এ সম্পর্কের শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই ভারত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। নিজেদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ভারত তার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল প্রায় এক কোটি শরণার্থীর জন্য। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঊষালগ্ন থেকে ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীকে আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করেছে। একটি গেরিলা যুদ্ধ কখনোই বিজয়ের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, যদি না তাদের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল থাকে, যা ভারত সরকার বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে দিয়েছিল। '৭১-এর নভেম্বরের শেষদিকে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হলে তখন হাজার হাজার ভারতীয় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্য প্রাণ দিয়েছেন; আহত হয়ে চিরদিনের মতো পঙ্গুত্ববরণ করেছেন আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য। বাংলাদেশে অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সঙ্গে তাই বাংলাদেশ ও ভারতীয় রক্তের এক সংমিশ্রণ ঘটেছে। আজ অর্ধশতাব্দী পর সেসব বীর বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগ আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
গত অর্ধশতাব্দীতে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় ও অগ্রাধিকার থাকা সত্ত্বেও এই উপমহাদেশের শান্তি ও উন্নয়নে অভিন্ন লক্ষ্যে দুই দেশ কাজ করে গেছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক মাঝেমধ্যে টানাপোড়েনের মধ্যে পড়লেও মোটাদাগে বাংলাদেশ ও ভারত সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিশেষ করে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে আমাদের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে গেছে, যাকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের স্বর্ণ যুগ বলা যেতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারতের চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে চিহ্নিত এবং এ ব্যাপারে কোনো বিরোধ নেই। এমন উদাহরণ বিশ্বে খুব কম দেশেই আছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের বঙ্গোপসাগরে নৌসীমানাও চিহ্নিত হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই এখন জোর দিচ্ছে কানেক্টিভিটিতে। সড়ক-রেল-নৌ ও আকাশপথে আরও সহজে যাত্রী ও পরিবহনের পথ সুগম হচ্ছে। আসলে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ নানাভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। যৎসামান্য সংযোগ যা ছিল, তাও ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। যার ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যাতায়াতের ভয়ানক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে উভয় দেশের জনগণ উপকৃত এবং উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
চীনের পরই ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। উভয় দেশের বাণিজ্য বর্তমানে ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এর প্রায় সবটাই ভারতের পক্ষে। ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারত বাংলাদেশে ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। অপরপক্ষে বাংলাদেশ মাত্র ৮০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এই অসামঞ্জস্য দূর করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে একটি ভারতীয় ইপিজেড তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ভারতীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের বাজারের জন্য শিল্পপণ্য উৎপাদন করে তাদের দেশে রপ্তানি করবে। ফলে আমাদের কর্মসংস্থান যেমন ঘটবে, তেমনি বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা হলেও কমবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম এলাকায়ও একটি ভারতীয় ইপিজেড তৈরির পরিকল্পনা আছে। চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর আমদানি-রপ্তানি বাড়ানো গেলে তা উভয় দেশের জন্য লাভজনক হতে পারে।


একই সঙ্গে এটা অনস্বীকার্য- বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বেশকিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, যার আশু সমাধান প্রয়োজন। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি। বলা হয়ে থাকে, একবিংশ শতাব্দীতে সুপেয় পানির সমস্যা বিশ্বজুড়ে সংঘাতের প্রধান কারণ হতে পারে। গত অর্ধশতাব্দীতে দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যা দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিক্ষেত্র ও শিল্পকারখানায় পানির প্রয়োজন বেড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমালয়ের বরফ গলছে। ফলে সুপেয় পানির পরিমাণ দ্রুত কমে আসছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ সব সময় বলে আসছে, অববাহিকাভিত্তিক পানির সুষ্ঠু ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আশু প্রয়োজন। কিন্তু এ ব্যাপারে ভারতের পক্ষ থেকে যথাযথ সাড়া আমরা পাইনি। যদিও ১৯৯৬ সালে গঙ্গার ফারাক্কা পয়েন্টে পানিবণ্টন চুক্তি হয়েছে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ অনেক নদীর পানিবণ্টন অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত যদিও বিরোধপূর্ণ নয়, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের প্রায়ই সংঘাতে লিপ্ত হতে দেখা যায়। যার ফলে সীমান্ত এলাকায় প্রাণহানি ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা প্রাণহানির শিকার হন, তারা নিরীহ গ্রামবাসী। বাংলাদেশ বারবার ভারত সরকারকে সীমান্ত অঞ্চলে মারণাস্ত্রের ব্যবহার বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে আসছে। ভারত এ ব্যাপারে বারংবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও প্রায়ই সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ-ভারত সুসম্পর্ক যারা চায় না, তারাই এসব ঘটনায় উৎফুল্ল বোধ করতে পারে। সীমান্ত যেন শান্তিপূর্ণ থাকে, সে ব্যাপারে দুই প্রতিবেশীর আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
উভয় দেশের মধ্যে গত প্রায় দুই দশক ধরে ধর্মীয় উগ্রবাদ, মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য এগুলো হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কখনও কখনও যদি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায় তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সংঘাত অনিবার্য। অতিসম্প্রতি আমরা উভয় দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর উগ্রবাদীদের হামলা প্রত্যক্ষ করেছি। বাংলাদেশ সরকার এদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা আশা করব, ভারতও কোনো রাজনৈতিক দল যেন ধর্মীয় উগ্রবাদ বা উন্মাদনায় উৎসাহিত না করে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিশ্বজুড়ে আজ একটি বিরাট সমস্য। আন্তর্জাতিক সীমানা এই সন্ত্রাসবাদ দমিয়ে রাখতে পারে না। সুতরাং বাংলাদেশ-ভারতের উচিত হবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্কে গড়ে তোলা, যাতে সন্ত্রাসবাদ এখানে শিকড় গাড়তে না পারে।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে চীন, জাপান, কোরিয়াসহ অনেক দেশ বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে। চীন এখন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ অংশীদার। এ ব্যাপারে ভারতের কোনো কোনো মহল হয়তো সংবেদনশীল হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী তার উন্নয়নের জন্য যতটুকু সহযোগিতা প্রয়োজন, তা গ্রহণ করবে। এটাই স্বাভাবিক। চীন ও ভারত যেমন বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ রপ্তানিকারক দেশ; একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও আমাদের পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। আমরা যেমন বিআরআইয়ে চীনের সঙ্গে অংশীদার; একইভাবে বিম্‌সটেক-বিবিআইএনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনে সক্রিয় অংশীদার। সবার প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়- বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতির এই মূলমন্ত্রই হবে আমাদের আগামী দিনের দিকনির্দেশিকা। ভারতের সঙ্গে আমাদের এই রূপরেখায় বহুমাত্রিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।
এয়ার কমডোর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী: নিরাপত্তা বিশ্নেষক; ট্রেজারার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক