মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টা। সাভার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় টিকাকেন্দ্র। সেখানে টিকা নিয়ে স্কুলের মাঠে বসে আছে অনেক শিক্ষার্থী। সবারই রয়েছে বাড়ি ফেরার তাড়া। কিন্তু প্রধান শিক্ষক না আসায় তারা যেতে পারছে না। তাদের একজন আমরিনা। সে ভাকুর্তা ইউনিয়নের ভাড়াড়িয়া টোটালিয়াপাড়ার কলাতিয়ার এলাকার ভিকেটি আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। সবার মতো আমরিনাও স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে করোনার প্রতিষেধক টিকা নিতে এসেছে। তাকে টিকা নেওয়ার কথা জিজ্ঞাসা করতেই বলে উঠল- ‘স্যার টিকা নিয়েছি। কিন্তু টাকা তো লাগল। শুনছিলাম টিকা নিতে টাকা লাগে না। কিন্তু আমাগো কাছ থেকে তো হেড স্যার টিকা দেওয়া বাবদ ২০০ টাকা করে নিছে।’

সেখানে থাকা আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী টাকা নেওয়ার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে আয়েশা নামে একজন শিক্ষিকা তাদের ধমক দিয়ে সরিয়ে দেন। এরপর ছাত্রছাত্রীরা একেবারে চুপ হয়ে যায়। পরে ওই শিক্ষিকার কাছেই টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বলেন, তিনি কোনো উত্তর দেবেন না। শুধু ভিকেটি স্কুল নয়, সেখানে টিকা নিতে আসা বিরুলিয়ার বেগুনবাড়ী স্কুলের শিক্ষার্থীরাও একই অভিযোগ করে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শুধু ভিকেটি আরও বেগুনবাড়ী স্কুলই নয়, সাভারের একাধিক স্কুল কর্তৃপক্ষ টিকা দেওয়ার নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে গাড়ি ভাড়া, নাশতা ও নিবন্ধন ফি বাবদ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কোনো স্কুল নিয়েছে একশ থেকে দেড়শ টাকা। আবার কোনোটা নিয়েছে দুইশ টাকা।

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল, মর্নিং গ্লোরি স্কুল, বেপজা স্কুল, বিকেএসপি স্কুল এবং সাভার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সাভারের ১১৯টি স্কুলের ৬৮ হাজার শিক্ষার্থী করোনার প্রতিষেধক টিকা পেয়েছে। সাভার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ওই পাঁচটি স্কুল নির্ধারণ করা হয়।

মঙ্গলবার ছিল সাভারের শিক্ষার্থীদের টিকা নেওয়ার শেষ দিন। তাই টিকাকেন্দ্রগুলোয় শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। টিকাকেন্দ্রেগুলোয় কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন না হলেও নিজ নিজ স্কুলে শিক্ষার্থীদের টাকা দিয়ে হয়েছে।

সাভার পৌর এলাকার মসজিদপুর প্রগতি মডেল স্কুলের শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, করোনায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো রকমে চলছে। অনেক স্কুল শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছে না। সরকার বিনামূল্যে টিকা দিলেও দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে যাতায়াতসহ নানাবিধ খরচ হয়। এ টাকা কে দেবে? তাই প্রতিটি স্কুলই ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে।

বিরুলিয়ার বেগুনবাড়ী স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হামিদ বলেন, মাসে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা বেতন পাই। করোনার মধ্যে অনেক কষ্ট করে চলছি। তাই নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের টিকাকেন্দ্রে নিতে পারিনি। যাতায়াত বাবদ ২০-৫০ টাকার মতো শিক্ষার্থীদের খরচ হতে পারে।

ভিকেটি আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেনের কাছে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি প্রথমে অস্বীকার করেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগের রেকর্ড রয়েছে জানালে তিনি যাতায়াত খরচ বাবদ নিয়েছেন বলে স্বীকার করেন।

করোনার টিকা দেওয়ার নামে যাতায়াত কিংবা নানাবিধ খরচ বাবদ টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুন নাহারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রানী বেগম বলেন, এটা স্কুল কর্তৃপক্ষের বিষয়। কোনো স্কুল অনিয়ম করলে দায়িত্ব তাদের।

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সায়েমুল হুদা সমকালকে বলেন, টিকাকেন্দ্র পরিচালনা করা আমাদের দায়িত্ব। টিকা দেওয়ার সময় কেউ টাকা নিয়ে থাকলে তার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। স্কুল কর্তৃপক্ষ অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ ব্যবস্থা নিতে পারে।