পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিদগ্ধ বামপন্থি নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, গীতশ্রীখ্যাত সংগীতশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও তবলাবাদক পণ্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় পদ্ম পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করায় ভারতে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে বিতর্ক চলছে। গত মঙ্গলবার দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার এবারের পুরস্কারপ্রাপ্ত ১২৮ জনের তালিকা প্রকাশ করে।
এর আগেও দেশটির অনেক গুণীজন পদ্ম পুরস্কারকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে 'তিরস্কার' আখ্যা দিয়ে তা গ্রহণ করেননি, কেউবা আবার গ্রহণ করেও পরে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আদর্শিক লড়াই, সরকারের কৃতকর্ম নিয়ে অসন্তোষ, আনুগত্যের শৃঙ্খলে বাঁধা না পড়া এবং অসামান্য কীর্তিময় জীবনে বিলম্বিত স্বীকৃতিতে অস্বস্তি- বলতে গেলে এই চার কারণে রাষ্ট্রীয় সম্মানকে কেউ নীরবে কেউবা সরবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতির মধ্য দিয়েই যেন তাদের কীর্তিতে যুক্ত হয়েছে মহিমার নতুন পালক।
জনসমাজ, শিল্প-সংস্কৃতি, রাজনীতি, ক্রীড়া, রাষ্ট্র ও সরকারের বিভিন্ন পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন, চিকিৎসা ও বিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫৪ সাল থেকে চার ক্যাটাগরিতে বিশিষ্টজনকে মর্যাদাপূর্ণ বেসরকারি পুরস্কারে ভূষিত করে আসছে।
ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার 'ভারতরত্ন'। এটি দেওয়া হয় চার বছর অন্তর। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার 'পদ্মবিভূষণ', তৃতীয় 'পদ্মভূষণ' ও চতুর্থ 'পদ্মশ্রী' পুরস্কার দেওয়া হয় প্রতি বছর। বাংলাদেশেরও অনেকে এসব সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তবে এবার কেউ তালিকায় নেই।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদার অলংকার পদ্ম পুরস্কার নিয়ে ভারতে এবার যেমন বিতর্ক দেখা দিয়েছে, তা আগের ঘটনাগুলোর চেয়ে ব্যতিক্রমীভাবে দেখা হচ্ছে। দেশটির প্রজাতন্ত্র দিবসের ঠিক আগে পদ্ম সম্মান প্রত্যাখ্যান করেছেন তিন বাঙালি- সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও তবলাবাদক পণ্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- এর আগে যারা এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন তাদের বেশিরভাগই বাঙালি। রাষ্ট্রীয় সম্মানকে জলাঞ্জলি দিতে গিয়ে যে যুক্তি ও আদর্শকে সামনে এনেছেন তারা তা রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা অসংগতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ আর ধিক্কার হিসেবেই সমাদৃত হয়েছে।
সব মিলে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের ঘটনাগুলো ভারতের রাজনীতিতে বড় প্রভাব রেখে গেছে এবং যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিবেচনা বোধকে নির্বুদ্ধিতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার পদ্মভূষণ পুরস্কারের জন্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নাম ঘোষণার পরই তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ নিয়ে তার ও তার দলের ভাষ্য- 'আমাদের কাজ মানুষের জন্য, পুরস্কারের জন্য নয়।' তবে এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিজেপি সরব হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কট্টর সমালোচক বুদ্ধদেবকে জড়িয়ে দলটির নেতা দিলীপ ঘোষ বলেছেন, কমিউনিস্টরা চিরদিন দেশের পরম্পরা-সংস্কৃতিকে অপমান করেছেন। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত বামপন্থি নেতা প্রয়াত জ্যোতি বসু ভারতরত্ন এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কমিউনিস্ট নেতা প্রয়াত ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ পদ্মভূষণ পুরস্কার একই কারণ দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
৯০ বছর বয়সী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের আট দশকের সংগীতজীবন কিংবদন্তিতুল্য। এতদিন পরে তাকে চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পদ্মশ্রী পুরস্কার দেওয়াকে 'অসম্মানজনক' বলে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি ও তার পরিবার। তাদের বক্তব্য, এই পুরস্কার কোনো কনিষ্ঠ শিল্পীর প্রাপ্য। গতকাল কলকাতায় সংবাদ সম্মেলন করে সংগীতশিল্পী কবির সুমন ও অন্যরা বলেছেন, শুধু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে নয়, পুরো বাংলাকে অপমান করেছে কেন্দ্র সরকার।
১৯৫৯ সালে পদ্মভূষণ সম্মান প্রত্যাখ্যান করেন 'থিয়েটারের মানুষ'খ্যাত শিশিরকুমার ভাদুড়ি। এর মধ্য দিয়ে থিয়েটারের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। তিনি বলেছিলেন, 'রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রকৃতপক্ষে সরকারের স্তাবক দল তৈরির একটি চেষ্টা মাত্র।'
১৯৭৪ সালে পদ্মশ্রী ফিরিয়ে দিয়েছিলেন খেয়াল ও ঠুমরি গানের কিংবদন্তি বাঙালি কণ্ঠশিল্পী তারাপদ চক্রবর্তী। এর পেছনে ব্যক্তিগত কারণ দেখালেও তার চাপা ক্ষোভ বলে দিচ্ছিল 'এ তো পুরস্কার নয়, অবহেলা।' বাংলা গানের আরেক নক্ষত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও তারাপদের মতো একই কারণে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন পদ্মশ্রী পুরস্কার। একাধিকবার পদ্ম পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বাংলার প্রখ্যাত নাট্যকার বাদল সরকার। তবে বাংলা চলচ্চিত্রের মহাতারকা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ১৯৭০ সালে পদ্মশ্রী ফিরিয়ে দিলেও ২০০৪ সালে ভক্তদের কথা মাথায় রেখে পদ্মভূষণ গ্রহণ করেছিলেন।
সন্ধ্যার মতো ২০১১ সালে পদ্মশ্রী প্রত্যাখ্যান করে সরোদ শিল্পী বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বলেছিলেন, 'আগেই অনেক কম বয়সী এবং অযোগ্য শিল্পী পদ্ম সম্মান পেয়ে গেছেন।' পরের বছর তাকে পদ্মভূষণ দিতে চাইলেও বিরাগভরে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
মাদার তেরেসা ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। তার বক্তব্য ছিল- তিনি ঈশ্বরের কাজ করেন এবং এর জন্য কোনো সম্মান দরকার নেই। পরে ১৯৬২ সালে কলকাতার আর্চবিশপের অনুরোধে তিনি পুরস্কার গ্রহণ করেন।
কৃষক আন্দোলনে মোদি সরকারের দমন-পীড়নের প্রতিবাদে এবং কৃষকদের দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ২০১৫ সালে পাওয়া পদ্মভূষণ পুরস্কার ২০২০ সালে ফিরিয়ে দেন পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল।
রাষ্ট্রীয় পুরস্কার গ্রহণে আপত্তিতে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার দু'বার পদ্মভূষণ প্রত্যাখ্যান করেন। 'সরকারের তোষামোদ তকমা' মুক্ত থাকার সাহসী যুক্তি দিয়ে সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তী ও কে সুব্রামানিয়াম এ পুরস্কার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
এবার আরেকটি ঘটনা নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে বিশেষ করে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ মতভেদকে প্রকট করে তুলেছে। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা গোলাম নবী আজাদকে পদ্মভূষণে পুরস্কৃত করায় কেউ কেউ তাকে মোদি-ভক্ত বলে টিপ্পনী কাটছেন। তবে শশী থারুরসহ দলটির সংস্কারপন্থিরা তাকে সমর্থন করেছেন।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, এবার বাদ দিয়ে ১৯৫৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ভারতরত্ন পাওয়া ৪৮ জনের মধ্যে তিনজন, পদ্মভূষণ পাওয়া এক হাজার ২৭৮ জনের মধ্যে ১১ জন, পদ্মশ্রী পাওয়া ৩ হাজার ২২৩ জনের মধ্যে ১৭ জন পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে পদ্মবিভূষণ পাওয়া ৩২১ জনের মধ্যে কারও প্রত্যাখ্যান করার তথ্য পাওয়া যয়নি।

বিষয় : ভারতে বিতর্কের বৃত্তে বেসামরিক পুরস্কার

মন্তব্য করুন