রাজধানীবাসী গত ছয় বছরে কেবল ৩৮ দিন বুকভরে নিরাপদ বায়ু নিতে পেরেছে। আর বাকি অধিকাংশ দিনই বায়ুর মান ছিল অস্বাস্থ্যকর থেকে দুর্যোগপূর্ণ। এই জানুয়ারির প্রথম ২৫ দিনের মধ্যে প্রতিদিনই খুব অস্বাস্থ্যকর বায়ু পেয়েছে নগরবাসী।
এদিকে, রাজধানীর বাতাসকে বিষিয়ে তোলার জন্য সবেচয়ে বেশি (৩০%) দায় অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজের। ২৯% দূষণের উৎস ইটভাটা ও শিল্পকারখানা। অন্যান্য উৎসের মধ্যে যানবাহনের কালো ধোঁয়া (১৫%), আন্তঃদেশীয় বায়ুদূষণ (১০%), গৃহস্থালি ও রান্নার চুলা থেকে নির্গত দূষণ (৯%) এবং বর্জ্য পোড়ানোর কারণে (৭%) বায়ুদূষণ হয়ে থাকে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ছয় বছরে ৩৮ দিন ঢাকার বায়ুর মান ভালো থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে ক্যাপসের পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার সমকালকে বলেন, এয়ার ভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণ (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) অনুযায়ী ৩৮ দিন রাজধানীর বায়ুর মান ছিল ০ থেকে ৫০, যাকে ভালো বলা হয়। ওই দিনগুলো ভারি বৃষ্টি, ঈদের ছুটি ও কঠোর লকডাউনের মধ্যে পড়েছে। এ সময়ে যানবাহন ও মানুষের চলাচল কম ছিল। কলকারখানা ও ইটভাটা বন্ধ ছিল।
ক্যাপস গবেষণায় পেয়েছে, রাজধানীর বায়ুদূষণের উৎসের একটি বড় বদল ঘটে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১২ সালের জরিপ অনুযায়ী ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস ছিল ইটভাটা (৫৮%)। এর এক যুগ পর ২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে বায়ুদূষণের মূল উৎস বলা হয় যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়াকে (৫০%)। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় গতকাল প্রকাশিত ক্যাপসের গবেষণা বলছে, ঢাকার বাতাসে দূষিত বস্তুর উৎস হিসেবে ইটভাটা এবং যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়ার স্থান দখল করেছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আর নির্মাণ কাজ।
জনস্বাস্থ্য ও দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, নগর পরিকল্পনায় ঘাটতি, আইনের দুর্বলতা ও আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতায় ঢাকায় বায়ুদূষণ বেড়েই চলছে। তিনি জানান, ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে ঢাকার মানুষ মাত্র ২% (৩৮ দিন) সময় ভালো বায়ু নিতে পেরেছে। ২৬% (৫১০ দিন) চলনসই মানের বায়ু, ২৯% (৫৭৭ দিন) সংবেদনশীল বায়ু, ২২% (৪৪৩ দিন) অস্বাস্থ্যকর, ১৯% (৩৮৫ দিন) খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ২% (৩৭ দিন) দুর্যোগপূর্ণ ছিল ঢাকার বায়ু। বিশ্বের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের হিসাবে ২০২০ সালের চেয়ে ২০২১ সালে ঢাকার বায়ুর মান ১২ শতাংশ খারাপ হয়েছে। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে গড় বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫ বছরের থেকেও ২০২১ সালে গড় বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েছে ৭ শতাংশ।
ক্যাপসের তথ্য বলছে, ঢাকা শহরে বিকেল ৪টার পর বায়ুর মান খারাপ হতে শুরু করে; যা রাত ১১টা থেকে ২টার মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে। গত ছয় বছর রাত ১টায় বায়ুর মান ছিল ১৬২, যা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ। রাত ১০টার পর উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে মালবাহী প্রচুর ট্রাক ঢাকায় ঢোকে। এগুলো থেকে ধুলার পরিমাণ বাড়ে। এ ছাড়া রাতে সিটি করপোরেশন ঢাকার রাস্তা ঝাড়ূ দেওয়ার নিয়ম চালু করার পর থেকে বাতাসে ধূলাবালি বেশি উড়ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল সরকারকে ঢাকা শহরের বায়ু সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সাধারণ মানুষকে জানানোর দাবি তোলেন। তিনি বলেন, বায়ুদূষণের কারণে ঢাকায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সেই উন্নয়ন চাই না, যা জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, সরকার সঠিক পরিকল্পনা নিলে ও বরাদ্দ ঠিকমতো খরচ করলে নির্মাণের দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। সংবাদ সম্মেলনে শুস্ক মৌসুমে ঢাকায় দৈনিক দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর পানি ছিটানো, নির্মাণ কাজের স্থান ঢেকে রাখা, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব কংক্রিটের প্রচলন, ফিটনেসহীন গাড়ি বন্ধ করাসহ ১৫টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়।