ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সেনা ও সমরাস্ত্র মোতায়েনের প্রেক্ষাপটে বাড়াবাড়ি রকমের যুদ্ধের শঙ্কায় ভুগছে পশ্চিমারা। ক্রমেই বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা। মস্কোর বিরুদ্ধে হামলার ছক আঁটার অভিযোগ করছে তারা। রাশিয়া ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা। বাস্তবে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে এর চেয়েও বড় সংকট তৈরি হবে ইউরোপে, একথা বলাই যায়। কারণ যুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়ার জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল এই মহাদেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এর প্রভাবে দেশে দেশে বিক্ষোভ দেখা দিতে পারে। তখন সরকারে টিকে থাকাই পশ্চিমা নেতাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

গত বছরের শেষ দিকে ইউক্রেন সীমান্তে লক্ষাধিক সেনা ও ভারী যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করে রাশিয়া। পরে তাদের প্রতিরোধের কথা বলে পূর্ব ইউরোপে সেনা ও গোলাবারুদ পাঠানোর ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশটির সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে সেনা মোতায়েন করছে ন্যাটো। তবে যুদ্ধ পরিকল্পনার সব অভিযোগ শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে রাশিয়া। মস্কো বলছে, তারা কিয়েভের সঙ্গে কোনো সংঘর্ষ চায় না। মূলত ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য হওয়া ঠেকাতেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে রাশিয়া। তবে পশ্চিমাদের দাবি, স্বাধীন দেশ হিসেবে ইউক্রেনের ন্যাটোর সদস্য হওয়ার অধিকার রয়েছে। দেশটি ওই সামরিক জোটের সদস্য হলে রাশিয়া নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে দাবি করে তা ঠেকাতে চায় তারা। বিশ্নেষকদের মতে, পশ্চিমাদের যতই প্রস্তুতি থাকুক না কেন, সবশেষে কিছু কারণে তাদের পিছু হটতে হতে হবে। রাশিয়ার জ্বালানি, ইউরোপের অর্থনীতি, বিভক্ত পশ্চিম, তাদের মস্কোনির্ভরতা, সামরিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি, ইউক্রেনের সক্ষমতা ও সুপরিকল্পনার অভাবে দৃঢ় অবস্থান থেকে সরতে হবে তাদের। খবর সিএনএন ও আলজাজিরার

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এরই মধ্যে ইউরোপের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে উঠেছে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ। ইউরোপের দেশগুলোর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়িঘরে জ্বালানি চাহিদা পূরণের সবচেয়ে বড় উৎস রাশিয়ার গ্যাস। নতুন করে তৈরি হওয়া ঘোলাটে পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এখন হন্যে হয়ে ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প খুঁজছে।

শীতকালে সবচেয়ে ঠান্ডার সময়টার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে ইউরোপ। এ মুহূর্তে বিকল্প জ্বালানির উৎস খুঁজে পাওয়া একটি কঠিন কাজ। এ কারণেই পুরো মহাদেশের জন্য জ্বালানির উৎস নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের পূর্ব ইউরোপ বিশেষজ্ঞ ইয়ানিস ক্লুগে বলেন, 'বাস্তবিক অর্থেই এর কোনো দ্রুত কিংবা সহজ বিকল্প নেই।'

রাশিয়ার গ্যাস ইউক্রেনের ওপর দিয়ে ইউরোপে পৌঁছেছে। রাশিয়া ওই পাইপলাইন বন্ধের মতো পদক্ষেপ নিলে তা জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হবে। নতুন পাইপলাইন কিংবা তরলিকৃত গ্যাস আমদানির জন্য স্থাপনা নির্মাণে কয়েক বছর সময় লাগবে। আর বিকল্প উৎস থেকে যদি বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি আনতে হয়, সেটা কাতারের মতো বড় গ্যাস রপ্তানিকারকদের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়।

মহামারির এই সময়ে বৈশ্বিক পরিবহন নেটওয়ার্ক ও বিশ্ববাজার যখন এক ধরনের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এ অবস্থায় কাতারেরও খুব বেশি কিছু করার সুযোগ সম্ভবত নেই। ইউরোপ এখনই জ্বালানির টানাপোড়েনের মধ্যে আছে। গ্যাসের দাম যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়ে গেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নিকোস টসাফস বলেন, 'ইউক্রেনের ভেতর দিয়ে বন্ধ-চালু-বন্ধ-চালু ব্যবস্থায় গ্যাস এলে তাও ইউরোপকে বেকায়দায় ফেলবে, তবে তখনও হয়তো কাজ চালানো যাবে। কিন্তু রাশিয়া থেকে জ্বালানি রপ্তানি পুরো বন্ধ হয়ে গেলে তা বিপর্যয় ডেকে আনবে। ওই পরিমাণ ঘাটতি পূরণ ইউরোপের জন্য অসম্ভব।'

পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের বরাতে খবরে বলা হয়েছে, ২০২০ সালেও রাশিয়া এককভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৩৮ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগান দিয়েছে, যার পরিমাণ ১৫ হাজার ৩০০ কোটি ঘন মিটার।

ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ জার্মানি রাশিয়ার জ্বালানির সরবরাহের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। বিশেষ করে তারা কয়লা ও পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পর এই নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে। ইতালি ও অস্ট্রিয়াও রাশিয়ার গ্যাসের ওপর টিকে আছে।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির প্রধান ফেইথ বিরোল এ মাসের শুরুর দিকে বলেছিলেন, বাজারমূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকার পরেও রাশিয়ার গ্যাস কোম্পানি গ্যাজপ্রম ২০২১ সালের শেষ তিন মাসে ইউরোপে রপ্তানি ২৫ শতাংশ কমিয়েছে। ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখতে একটি বিকল্প হতে পারে এলএনজির সরবরাহ বাড়ানো, যা পাইপলাইনের বদলে সমুদ্রগামী ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে সরবরাহ করা সম্ভব।

ইনডিপেনডেন্ট কমোডিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের এলএনজি বাজার বিশ্নেষক অ্যালেক্স ফ্রলি বলেন, বৈশ্বিক এলএনজি উৎপাদন এরই মধ্যে বলা যায় সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। তাছাড়া বাণিজ্যিক পথগুলো বদলানোর চেষ্টা হলে জাহাজ চলাচলে একটি জটিলতা সৃষ্টি হবে।

ডিসেম্বরে বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারকের স্থান দখল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা হয়তো উৎপাদন কিছুটা বাড়াতে পারে। কাতার, যারা ইউরোপের পাঁচ গুণ এলএনজি এশিয়ায় রপ্তানি করে, তারাও উৎপাদন বাড়াতে পারে। কিন্তু তা দিয়েও পুরো ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা।

সিএসআইএসের টসাফস বলছেন, রাশিয়া থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ওই ঘাটতি মেটানোর তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে ইউরোপে নেই। কারণ রাশিয়ার জ্বালানি ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ ইকোসিস্টেমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। জার্মান কর্মকর্তা ক্লুগ বলেন, 'এই শীতে রাশিয়ার গ্যাস ছাড়া আমাদের আসলেই কোনো বিকল্প নেই।'

শুধু এ কারণেই নয়, পশ্চিমাদের আরও বেশ কিছু কারণে পিছু হটতে হবে। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের বিশ্নেষক ক্লারা ফেরেইরা মার্কেস ও আন্দ্রেয়াস ক্লুথ বলেছেন, এখনও পশ্চিমারা পুতিনকে মোকাবিলার মতো পরিকল্পনাও করতে পারেনি। বাস্তবতা হচ্ছে, এটি ইউরোপের জন্য দুঃস্বপ্ন। পুতিনের আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কৌশল প্রয়োগ কীভাবে করতে হবে, তা তাদের জানা নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের মধ্যে ২১টি ন্যাটো জোটের সদস্য রাষ্ট্র। তারা মিত্র ইউক্রেনের পক্ষে দাঁড়াবে বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। পুতিন বাহিনী আক্রমণ করলে তারা তাতে ভীত হয়ে পড়বে। এর পেছনের কারণ রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের চুক্তি, বাণিজ্য ও প্রভাবশালী কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে ইউরোপের সুপারপাওয়ার জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পক্ষে নয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট ওলাফ শলসের দলও এক অর্থে রাশিয়াপন্থি। আরেক সুপারপাওয়ার ফ্রান্সও শুরু থেকে রাশিয়া ও মিত্রদের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিশ্নেষক প্রশ্ন তুলে বলেছেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে কিনা। বিষয়টি তা নয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকলেও আগ্রাসন মোকাবিলায় ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছে। এর বাইরে সাইপ্রাস ও গ্রিসের মতো দেশগুলোতে রাশিয়ার ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে। যে কারণে তারাও মস্কোর বিরুদ্ধে যেতে পারবে না। আর প্রতিবেশী বেলারুশও রাশিয়ার মিত্র, তারা মস্কোর সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এর বাইরে ক্রোয়েশিয়া ও ইতালির সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে রাশিয়ার। এ ছাড়া আঞ্চলিকভাবে রাশিয়ার সঙ্গে শত্রুতা করে ট্রান্সআটলান্টিক অঞ্চলে টেকা যথেষ্ট কঠিন বলে মনে করেন বিশ্নেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ফেলো ব্রুনো লেতে বলেছেন, কিছু ইউরোপীয় দেশের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্যই হচ্ছে রাশিয়াকে তুষ্ট করা। তাদের লক্ষ্য মস্কোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানো।

রাশিয়া ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের ফেলো ইভানা স্ট্রেদনার বলেছেন, ইইউর ভূরাজনৈতিক শক্তির দুর্বলতার কারণে রাশিয়ার প্রতি বিভিন্ন দেশের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন রয়েছে।