গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে চলতি মাসে ৯টি জেব্রার মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই এবার রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় মারা গেল একটি সিংহী। ২৫ জানুয়ারি সিংহীটি মারা গেলেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে গোপন রাখে। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে সমকালের কাছে এ-সংক্রান্ত তথ্য আসার পরও চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ তথ্য দিতে গড়িমসি করে। তবে এক পর্যায়ে সিংহীর মৃত্যুর ঘটনা স্বীকার করে নেয় কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, ইতোমধ্যে রাজধানীর কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতালে সিংহীটির ময়নাতদন্তও শেষ হয়েছে। এতে বলা হয়েছে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মারা গেছে। এ ছাড়া সরকারের কেন্দ্রীয় রোগ গবেষণাগারে (সিডিআইএল) সিংহীটির নমুনা পাঠানো হয়েছে। ওই রিপোর্ট এলেই মৃত্যুর বিস্তারিত কারণ জানা যাবে।

এ বিষয়ে জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ডা. আব্দুল লতিফ সমকালকে শুক্রবার রাত ১১টার দিকে বলেন, ‘চিড়িয়াখানায় মাঝেমধ্যেই প্রাণী অসুস্থ হয়।' গত কয়েকদিনে কোনো প্রাণী মারা গেছে কিনা— এ প্রশ্ন করা হলে তিনি এর জন্য কিছুক্ষণ সময় চান। এরপর রাত ১২টা পর্যন্ত তাকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তবে এর মধ্যে রাত পৌনে ১২টায় জাতীয় চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নাজমুল হুদা সিংহী মারা যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘গত ২৫ জানুয়ারি সিংহীটি হঠাৎ মারা যায়। কোনো রোগ কিংবা অসুস্থতা ছিল না সিংহীটির। এর বয়স ছিল ১২ বছর। গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক থেকে প্রাণী বিনিময়ের মাধ্যমে এটিকে আনা হয়েছিল।’

তিনি জানান, ময়নাতদন্ত রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ লেখা রয়েছে। তবে ল্যাব রিপোর্ট আসার পর বিস্তারিত জানা যাবে। 

সিংহীটির নাম তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি এ চিকিৎসক।

প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিংহের গড় আয়ু প্রায় ২০ বছর। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হৃদরোগে অনেক প্রাণীই মারা যায়। সাধারণত একাকিত্ব ও বিষণ্ণতায় হৃদরোগে প্রাণী আক্রান্ত হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বের আট প্রজাতির সিংহের মধ্যে মিরপুর চিড়িয়াখানায় তিনটি আফ্রিকান প্রজাতির এবং একটি এশীয় প্রজাতির সিংহ ছিল। তাদের মধ্যে সিংহ কেবল আফ্রিকান প্রজাতির একটি। 

গত বছরের মে মাসেও পুরুষ সঙ্গীর অভাবে তিনটি সিংহীর মধ্যে ‘নেতিবাচক পরিবর্তন’ দেখতে পাওয়ার কথা সমকালকে জানিয়েছিলেন মিরপুর চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারা। সঙ্গীহীন প্রাণীদের স্বস্তি দিতে চেষ্টা চালালেও করোনাভাইরাস মহামারির কারণে তা সম্ভব হয়নি বলেও তারা জানান।

২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক থেকে চারটি সিংহ নিয়ে আসা হয় মিরপুর চিড়িয়াখানায়। এর মধ্যে দুটি সিংহ সাফারি পার্কে জন্মানো, বাকি দুটি সিংহী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা। মারা যাওয়া সিংহীটিও বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের।

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মানো সিংহী মুক্তার পুরুষ সঙ্গী মতি সাফারি পার্কে জন্মেছিল ২০১৫ সালে। জন্মগত ত্রুটির কারণে মতি মারা যায় ২০১৯ সালে, এরপর থেকেই সঙ্গীহীন মুক্তা। সঙ্গীহীন থাকার কারণে মুক্তার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আচরণগত বিভিন্ন পরিবর্তন দেখতে পায় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। মারা যাওয়া প্রাণীটির নাম জানতে গতকাল রাত পৌনে ১টা পর্যন্ত একাধিক কর্মকর্তাকে বারবার ফোন করা হলেও ফোন রিসিভ হয়নি।

গত বছরের মে মাসে জাতীয় চিড়িয়াখানার ‘জু অফিসার’ গোলাম আজম এ বিষয়ে সমকালকে বলেছিলেন, মুক্তা আগে স্বতঃস্ম্ফূর্ত থাকত। এখন একা একা থাকে, গর্জন কম করে। নিরিবিলি থাকে।

এর আগে গত বছরের ২১ নভেম্বর চিড়িয়াখানায় বেঙ্গল টাইগার টগর ও বেলি জুটির প্রথম শাবক দুর্জয় আর অবন্তিকার মৃত্যু হয়। সেটসি ফ্লাই নামে এক ধরনের মাছির কামড়ে ট্রিপানোসোমিয়াসিস রোগে তারা প্রাণ হারায়। সেই ঘটনাও জানাজানি হয়েছিল এক সপ্তাহ পর ২৯ নভেম্বর। তখন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছিল।