ঘন্টায় দেড়শো কিলোমিটার বেগে ছুটছেন উমরান মালিক। কাশ্মিরী বালকের পেসে রীতিমতো ঝড় বইছে আইপিএলে। বিশ্বক্রিকেটেও আগামীতে তেড়ে আসতে পাড়ে এই ঝড়। ভারতের এই নতুন স্পিড স্টার যেভাবে এগোচ্ছেন তা যেন সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানতে চলেছে।

গল্পটা আমাদের চারপাশের অনেকের মতোই। পড়ালেখা মন নেই, এ পাড়া ও পাড়ায় টেনিস টুর্নামেন্ট খেলে বেড়ান। হাতে কিছু পয়সাও থাকে। এভাবেই বেশ চলছিল তার। বাবার ফলের দোকানে মাঝে মধ্যে বসলেও হিসাবে মন নেই। সুযোগ পেলেই দোকানে কাউকে বসিয়ে চলে যান খেলতে।

ছেলের ভবিষ্যৎ যে রসাতলে, ক্লাস টেনে ড্রপ আউটের পর দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন তার বাবা। কিন্তু গল্পের মোড় ঘুরে যায় একদিন। কাশ্মীরি বালক উমরান মালিকের কিছু বন্ধু মিলে জম্মুতে একটি পেসার হান্টের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন। একে একে যখন উমরানের নাম আসে তখনই প্রশ্নের মুখে ডিসকোয়ালিফাই হয়ে যান। কোনো জেলার হয়ে টুর্নামেন্ট খেলেনি- এই অযোগ্যতায় নেটে বোলিং করতে দেওয়া হয়নি তাকে।

অপমানিত উমরান পরের দিন নাম গোপন করেই ফের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন। এদিন আর আগের দিনের সেই কর্মকর্তা ছিলেন না, তাই নেটে একটি বল করার সুযোগ মেলে। ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার গতিতে করা ওই একটি বল করেই উপস্থিত কোচের নজরে আসেন উমরান। তাকে সিলেক্ট করা হয় নেট বোলার হিসেবে।

কাশ্মীরের বিপক্ষে সেবার খেলা ছিল আসামের, নেটে উমরানের দায়িত্ব পড়ে আসামের ব্যাটারদের বোলিং করার। তাকে দেখে আসামের কোচ অজয় রাত্রা কাশ্মীর কোচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন উমরানকে কেন তারা খেলাচ্ছেন না। এর পরই বছর সতেরোর উমরানকে কাশ্মীরের স্পোর্টস কাউন্সিলের বয়সভিত্তিক কোচ মানহাসের কাছে পাঠানো হয়।

কিন্তু সেখানেও কোচিংয়ে একদিন আসে তো তিন দিন আসেন না উমরান। ‘ধমক দিয়ে তার কাছে না আসার কারণ জানতে চাইলে সে বলে টেনিস টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিল সে, কিছু অর্থও পেয়েছিল। বুঝতে পারলাম উমরান তখনও বোঝেনি তার জন্য কী অপেক্ষা করছে সামনে।’ কোচ মানহাস জানান এরপর কাশ্মীরের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে পাঠিয়ে দেন উমরানকে। সেখানে কোনো ম্যাচ খেলারই সুযোগ হয়নি তার।

সাইড বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে আবার টেনিস বলের টুর্নামেন্টে ঝুঁকে পড়েন গুজ্জার নগরের ছেলেটি। আর তখনই আরেক জহরির চোখে পড়েন উমরান। জন্মু-কাশ্মীর ক্রিকেটের পরামর্শক হয়ে আসেন ইরফান পাঠান। উমরানের ন্যাচারাল পেস তাকে মুগ্ধ করে। শুধু বোলিং অ্যাকশনে খানিক বদল এনেই উমরানকে প্রথম কাশ্মীরের বাইরের জগতে নিয়ে আসেন ইরফান। বন্ধুর জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তখন কাশ্মীরের আরেক অলরাউন্ডার আব্দুল সামাদও।

আইপিএলে প্রথমবারের মতো হায়দরাবাদ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে নেট বোলার হিসেবে আরব আমিরাতে যান উমরান। সেখানেও নেটে গতির ঝড় তোলেন, কিন্তু ম্যাচ খেলার ভাগ্য তার খুলছিল না। হায়দরাবাদের পেসার নটরাজন কভিডে আক্রান্ত হলে অনেকটা বাধ্য হয়েই ম্যাচে নামাতে হয় উমরানকে। প্রথম ম্যাচে উইকেট না পেলেও ওভারের ছয়টি বলেই একশ চল্লিশের ওপর গতি তুলে তার আগমনী বুঝিয়ে দেন।

আর এবার তো আইপিএলের সমস্ত রেকর্ড এলোমেলো করে দিচ্ছেন উমরান তার হাতের গোলা দিয়ে! ১৫৩ থেকে ১৫৪ কিলোমিটার উঠে যাচ্ছে তার গতি। সেই সঙ্গে বিধ্বংসী সব ইয়র্কার। গুজরাটের বিপক্ষে ২৫ রানে ৫ উইকেট নিয়ে রীতিমতো বিশেষজ্ঞদের চোখে আগামীর 'স্পিড স্টার' তকমা পেয়ে গেছেন। শুভমন গিলকে ১৪৪ কিলোমিটারের গতিতে, ঋদ্বিমানকে ১৫৩ কিলোমিটারে আর ডেভিড মিলারকে ১৪৮ কিলোর গতিতে পরাস্ত করেছেন।

শোয়েব আখতার, ব্রেট লি, শট টেইটের পর ১৫০-এর ওপর নিয়মিত গতি তুলতে কাউকে দেখা যায়নি। তাই হায়দরাবাদের কোচ ডেল স্টেইন থেকে শুরু করে ইএসপিএন ক্রিকইনফোর বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল ভেট্টরি আর ক্রিস লিনরা ঘোষণাই করে দিয়েছেন বিশ্বক্রিকেট কাঁপাতে আসছেন উমরান মালিক। ভারতের ফ্ল্যাট উইকেটেই যে কিনা এমন গতি ছোটাতে পারেন তিনি এবারে অস্ট্রেলিয়ায় টি-২০ বিশ্বকাপে কী করতে পারেন, তার একটা আঁচ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

যাকে নিয়ে এত কথা সেই উমরান অবশ্য নতুন লক্ষ্য ঠিক করে নিয়েছেন- 'ঘণ্টায় ১৫৫ কিলোতে বোলিং করতে চাই এবার।’ বছর কুড়ি আগে বিশ্ব ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬১.৩ কিলোমিটারে সর্বোচ্চ গতির বোলিং করেছিলেন শোয়েব আখতার। উমরান নিয়ে ভারত শোয়েব আখতারের সেই রেকর্ড ভাঙার স্বপ্ন দেখতেও পারে।