'আমাদের দয়িতা ফাউন্ডেশন মূলত নারীদের নিয়ে গঠিত। আমরা নারীবিষয়ক সব বিষয় নিয়ে কাজ করে থাকি।' বলছিলেন দয়িতা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা নূপুর আক্তার নোভা। ফাউন্ডেশনটির কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেক নারী সুশিক্ষায় বেড়ে উঠবে, তারা নিজ অধিকার, প্রতিরক্ষা, সাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকবে। তারা চেষ্টা করে সমাজে নারীদের নিয়ে প্রচলিত ট্যাবু ভেঙে দিয়ে তাদের সুন্দর একটি সমাজ দিতে, যেখানে তারা নিজেদের জন্য সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর একটি জীবন গড়ে নিতে পারে।

প্রত্যয়ী নোভা বলেন, আমরা নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নারীর শিক্ষা, নারী অধিকার, বাল্যবিয়ে রোধ, মাসিক সুরক্ষা ও সচেতনতা, মাসিককালীন কুসংস্কার রোধ, নারীর মানসিক সাস্থ্য, বাচ্চাদের নিরাপদ-অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতনতা এবং নারীর আত্মপ্রতিরক্ষা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি এর সঙ্গে আরও যোগ করে বলেন, 'আমরা এমন একটি জায়গা দিয়ে আমাদের কাজ শুরু করেছি, যা গ্রাম কিংবা পুরোপুরি শহরের মধ্যে পড়ে না। আমরা মূলত যে জায়গাটায় কাজ করছি, সেখানে নারীরা নিজেদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মাসিক সুরক্ষা, বাল্যবিয়ে কিংবা নিজ প্রতিরক্ষা বিষয়ে সচেতন নয়। তাদের অনেকেই গৃহকর্মী কিংবা গার্মেন্ট কর্মী এবং তাদের অধিকাংশই স্বল্প শিক্ষিত। তারা নিজ স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা নিজ অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার নয়; বরং তারা বিভিন্ন কুসংস্কার ও গোঁড়ামির মধ্যে আটকে পড়ে আছে। তারা জানে না, মাসিককালীন কী কী করণীয় রয়েছে কিংবা বাল্যবিয়ের ক্ষতিকারক দিক কী কী। এ ছাড়া তারা মাসিককালীন অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার করে থাকে এবং তা সঠিক উপায়ে ব্যবহারের নিয়মটা পর্যন্ত জানে না।'

আমাদের আশপাশের মেয়েদের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক নারী আছে, তারা এ বিষয় নিয়েও অসচেতন। দয়িতা ফাউন্ডেশন এসব নারী নিয়ে কাজ করে।

ফাউন্ডেশনটি শিক্ষার্থীদের মাঝে প্যাড বিতরণ করার পাশাপাশি তাদের মাসিক সুরক্ষা, বাল্যবিয়ে, নিজ প্রতিরক্ষা, নিরাপদ-অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার বিষয়ে কাজ করছে। তা ছাড়া আশপাশের এলাকায় ১ হাজার ৫০০ নারীর মাঝে প্যাড বিতরণ করার সঙ্গে তাদের সঙ্গে বাল্যবিয়ে, মাসিককালীন করণীয়, প্যাড ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান ও বিভিন্ন কুসংস্কার থেকে বিরত থাকার কথাও বলেছে। নোভা বলেন, 'আমি আমার সংগঠন শুরু করার আগে অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছি। তবে সেখানে আমার কাজে স্বাধীনতা ছিল না এবং এখানকার সমস্যার সঙ্গে তাদের কাজের কোনো মিল ছিল না। এই কারণগুলোই আমার চিন্তা এবং আগ্রহ সৃষ্টি করে নিজে কিছু করার। আমি যে জায়গায় থাকি, সেখানে এসব বিষয় নিয়ে এর আগে বা পরে কখনও কেউ কাজ করেনি।

আর আমার কাজের এই চিন্তাগুলো কিংবা এমন বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার চিন্তা মাথায় আসে, কারণ আমি নিজেও এসব বিষয়ে ভুক্তভোগী। যেমন আমার জীবনের প্রথম মাসিকের সময়টা খুবই ভয়াবহ ছিল। কারণ, আমার মা-বাবা কিংবা শিক্ষিকা কেউ আমাকে মাসিক সম্পর্কে কখনও কিছু বলেনি। আমার জীবনের প্রথম পিরিয়ড শুরু হয় স্কুলে ক্লাসরত অবস্থায়। হুট করে এমন রক্তাক্ত অবস্থায় নিজেকে আবিস্কার করে খুবই ভয় পেয়ে যাই। এর মাঝেই অসহনীয় পেটে ব্যথা। আমি তো ভাবছিলাম, আমি হয়তো মরেই যাব।

স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে কান্না করতে করতে বাসায় চলে আসি। বাসায় আসার সময় রাস্তায় আমাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। মনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এরপর বাসায় আসার পর মা আমাকে বলেন, এটা স্বাভাবিক- প্রত্যেকটা মেয়েরই হয়ে থাকে। এ রকম অনেক অভিজ্ঞতা নারীদের নিয়ে কাজ করার বিষয়ে আমাকে আগ্রহী করে তুলেছে।' প্রতিটি নারী নিজ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অধিকার, প্রতিরক্ষা, অনিরাপদ স্পর্শ এবং বিভিন্ন কুসংস্কার থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে এসে নিজ লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা ও একটু অনুপ্রেরণা। নোভার দয়িতা ফাউন্ডেশন সে কাজটি করে যাচ্ছে নিরলসভাবে।