সাধারণ মানুষের হাতে সড়কে এমপি-মন্ত্রীদের মার খাওয়া, তাদের বাড়িতে ক্ষুব্ধ জনতার আগুনের জন্য মাহিন্দা রাজাপাকসেই দায়ী। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অনুগত গুন্ডাদের দিয়ে হামলা করিয়ে মাহিন্দাই আন্দোলনকারীদের বিক্ষুব্ধ-সহিংস করে তুলেছেন। শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীনদের ওপর সাধারণ মানুষের নিষ্ঠুর বদলার কারণ রাজাপাকসে পরিবারের বহু বছরের কুশাসন, ক্ষমতার দম্ভ ও দুর্নীতি। যেসব এমপি, মন্ত্রী, রাজনীতিক সাধারণ মানুষের চোখে দুর্নীতিবাজ, তারাই আক্রান্ত হচ্ছে।
অনিন্দ্যসুন্দর শ্রীলঙ্কার রাস্তায় মারামারি, রাজনীতিকদের ধাওয়া করে পেটানোর ছবি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কার সম্মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। কিন্তু আজকের এ অবস্থার জন্য জনগণ নয়, ক্ষমতাসীনরাই দায়ী। মাহিন্দা রাজাপাকসে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর আগে তার সমর্থকদের নানা অঞ্চল থেকে বাসে করে এনে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে জমায়েত করেছিলেন নিজের জনপ্রিয়তা দেখাতে। এটা তিনি সব সময় করে থাকেন। তিনি এখনও ভাবেন, তিনি খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু অনুগত সুবিধাভোগী সমর্থক ছাড়া কেউ তাকে এবং তার ভাই প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসেকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না।

মাহিন্দার হুকুমেই তার সমর্থকরা সোমবার নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে। তাদের তাঁবু, ব্যানার, ফেস্টুন পুড়িয়ে দেয়। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা তরুণ আন্দোলনকারীদের রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছে।
এর পাল্টা আঘাত হিসেবে আন্দোলনকারীরা বিক্ষুব্ধ সহিংস হয়ে ওঠে; প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে আগুন দেয়।

আমি নিশ্চিত করে বলছি, এই তরুণরা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও সমর্থক নয়। বিরোধী দলগুলোই তো কয়েক বছর আগে ক্ষমতায় ছিল। তারাও দেশের জন্য করেনি। তারা জনগণের চোখে দুর্নীতিবাজ। কিন্তু মাহিন্দা সব সীমা পার করেছেন। শুধু সুইস ব্যাংকে নয়, নাইজেরিয়াতেও মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন। গোটাবায়া ও মাহিন্দা- এই দুই ভাইয়ের শাসনে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে।

জনগণ তাদের আর চাইছে না- এটা বোঝার পরও দুই ভাই ক্ষমতা ধরে রাখতে নাছোড়বান্দা। সেনাবাহিনী ও পুলিশকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন। এখন পর্যন্ত যত মানুষ হতাহত হয়েছে, বেশিরভাই হয়েছে পুলিশের গুলি ও টিয়ার গ্যাসে। পুলিশেরও সুমতি হওয়া প্রয়োজন। আইনজীবী, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, তরুণসহ সবাই রাজাপাকসে পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ। পুলিশের তা বোঝা উচিত; জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো উচিত। গোটাবায়া সেনাবাহিনী ও পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দিয়েছেন। এতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ও সহিংসতা ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হবে না।

কিন্তু বিরোধীদেরও দায় আছে। তারা জনগণের জন্য খুব বেশি করেনি। বিরোধী দলগুলো জনগণের সুরে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়ার পদত্যাগ চাইলেও সাধারণ মানুষ তাদেরও চায় না। শ্রীলঙ্কায় এখন যে লড়াই চলছে, তা সরকার বনাম জনগণ। আরও স্পষ্ট করে বললে মাহিন্দা ও তার অনুগতদের বিরুদ্ধে জনতার লড়াই চলছে। এখানে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা গৌণ। তারা বড়জোর এই লড়াইয়ের দর্শক মাত্র।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আন্দোলনকারী তরুণরা অসংগঠিত। তারা একটি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিলেও দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে সক্ষম নন। তাই গোটাবায়া পদত্যাগ করলে কী হবে- তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিরোধী দলগুলো ক্ষমতায় যেতে যদিও তার পদত্যাগের অপেক্ষায় রয়েছে; কিন্তু তারা কি শ্রীলঙ্কাকে সমস্যামুক্ত করতে পারবে? খাবার, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারবে? পারবে না। বিলাসী প্রকল্পের জন্য নেওয়া বিদেশি ঋণ ফেরত দিতে পারবে? পারবে না। শ্রীলঙ্কার যে দেউলিয়া দশা হয়েছে, তা দূর করতে পারবে? পারবে না।

মাহিন্দা ও গোটাবায়ার মাঝের সময়টাতে যিনি প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তারাও কিন্তু একই ধারার রাজনীতি করছেন। সাধারণ মানুষকে উন্নয়নের গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলেন। সাধারণ মানুষ বাস্তবতা জেনে গেছে। ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর ঋণের টাকায় করা উন্নয়নের গোমর সাধারণ শ্রীলঙ্কানরা জেনে গেছেন। তারা আর এ ধারার রাজনীতি চান না।

সাধারণ মানুষ চায়, প্রেসিডেন্ট গোটাবায়ার অবিলম্বে পদত্যাগের পর একটি সাধারণ নির্বাচন। তারা চায়, নির্বাচনের পর জাতীয় ঐকমত্যের সরকার, যারা শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে। স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারবে। সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও প্রচেষ্টা ছাড়া শ্রীলঙ্কাকে খাদের কিনারা থেকে ফেরানোর আর উপায় নেই। কিন্তু গোটাবায়া যদি ক্ষমতায় থাকার জেদ ধরে রাখেন, তাহলে আরও রক্ত ঝরবে, আরও সহিংসতা হবে; শ্রীলঙ্কা খাদে পড়বে। কেউ বাঁচাতে পারবে না। শ্রীলঙ্কার একজন ত্রাতা চাই। জনগণই তা খুঁজে বের করবে।

[লেখক :শ্রীলঙ্কার এনজিও 'সর্বদয়া শান্তি সেনা'র প্রজেক্ট ম্যানেজার]