শ্রীলঙ্কায় নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হলেও বিক্ষোভকারীরা তাতে সন্তুষ্ট নয়। দেশের বিপর্যয়কর অর্থনৈতিক সংকটের জন্য প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে কারফিউকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই বিক্ষোভকারীরা রাজপথে অবস্থান করছে। অন্যদিকে দেশটির প্রবীণ রাজনীতিক রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হলেও নতুন মন্ত্রিসভা গঠনে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। এদিকে গত সপ্তাহে দেশটির সরকারদলীয় এক এমপির আত্মহত্যার খবর এলেও ফরেনসিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে গণবিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভ দমনে কারফিউ জারি করা হলেও তা কাজে আসেনি। কলম্বোয় সমুদ্রের তীরে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বাইরে স্থাপিত তাঁবুতে অবস্থান নিয়ে শত শত লোক জানিয়ে দিয়েছে, গোটাবায়ার পদত্যাগ ছাড়া তারা ঘরে ফিরবে না।

তাঁবুতে অবস্থানরত চামালগে শিবকুমার বলেন, 'জনগণ ন্যায়বিচার পেলেই শুধু আমরা এই লড়াই বন্ধ করব। তারা যাকেই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করুক না কেন, জনগণ স্বস্তি না পাওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবেই।'

বিক্রমাসিংহে দেশটির সংসদে তাঁর ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) একমাত্র সাংসদ এবং সরকার গঠনের জন্য তাঁকে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে হবে। রাজাপাকসের নেতৃত্বে একটি জোট পার্লামেন্টের ২২৫টি আসনের মধ্যে প্রায় ১০০টি দখল করে রেখেছে। সংসদে বিরোধীদের রয়েছে ৫৮টি আসন। বাকিরা স্বতন্ত্র। বিক্রমাসিংহে শুক্রবারও একটি ঐক্য সরকার গঠন করতে হিমশিম খান। জ্যেষ্ঠ এক বিরোধী নেতাকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে চাইলে তিনি তা নিতে অস্বীকার করেন।

বিরোধী দলের ওই সাংসদ হার্শা ডি সিলভা প্রকাশ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এর পরিবর্তে তিনি সরকারের পদত্যাগের জন্য চাপ দেবেন। তিনি বলেন, জনগণ এখন রাজনৈতিক খেলা আর চুক্তি চায় না। তারা একটি নতুন ব্যবস্থা চায়, যা তাদের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করবে।

সিলভা বলেছেন, তিনি গোটাবায়াকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য জনগণের সংগ্রামে যোগ দিচ্ছেন এবং তাঁকে বহাল রেখে কোনো রাজনৈতিক মীমাংসাকে সমর্থন করবেন না।

এদিকে বিক্ষোভকারীরা বলছে, বিক্রমাসিংহের নিয়োগ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কমাতে কোনো ভূমিকা রাখবে না। গোটাবায়াই এই সংকটের জন্য দায়ী।

শপথ নেওয়ার পর বিক্রমাসিংহে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আগামী মাসগুলোতে বিদ্যমান ভয়াবহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'আমরা জাতিকে এমন একটি অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে চাই, যেখানে আমাদের জনগণ আবার তিন বেলা খাবার পাবে।'

এদিকে শুক্রবার কলম্বোতে ভারতের হাইকমিশনার বিক্রমাসিংহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগের পর কোনো বিদেশি সরকারের প্রতিনিধির সঙ্গে এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশ্য বৈঠক। পরে কলম্বোতে ভারতীয় হাইকমিশন একটি টুইটে বলেছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং স্থিতিশীলতার জন্য অব্যাহত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

নয়াদিল্লি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শ্রীলঙ্কায় প্রভাব বাড়ানোর জন্য চীনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বিক্রমাসিংহেকে পশ্চিমাপন্থি মুক্তবাজার সংস্কারবাদী হিসেবে দেখা হয়।

নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি সংসদে তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দেবেন। প্রেসিডেন্ট গোটাবায়ার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখা উচিত বলেও তিনি মত দিয়েছেন।

সেই এমপির মৃত্যু গণপিটুনিতে :গত সপ্তাহে একজন সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যাকারী শ্রীলঙ্কার সেই আইনপ্রণেতাকে পরে ক্ষুব্ধ জনতা পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে শুক্রবার ফরেনসিক রিপোর্টে বলা হয়েছে। গত সোমবার তাঁর লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ বলেছিল, তিনি নিজের গুলিতে আত্মহত্যা করেছেন।

অমরকির্থী আথুকোরালা নামে সরকারদলীয় ওই এমপি নিতাম্বুয়া শহরে তাঁর গাড়ি অবরোধকারী লোকদের ওপর গুলি চালান। সেদিন সরকার সমর্থকরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালালে দেশটিতে নজিরবিহীন সহিংসতা দেখা দেয়। এরপর রাতভর সরকারদলীয় নেতাদের বাড়িতে আগুন দেয় ক্ষুব্ধ জনতা। এতে ওই এমপি ও তাঁর দেহরক্ষীসহ অন্তত ৯ জন নিহত হয়ে প্রায় ৩০০ লোক আহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর পুলিশ দাবি করে, আথুকোরালা একটি ভবনে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং প্রায় পাঁচ হাজার লোক তাঁকে ঘিরে ফেললে তিনি নিজের গুলিতে মারা যান।

তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে লঙ্কাদীপা পত্রিকা বলেছে, একাধিক আঘাত, হাড় ভেঙে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে এমপির মৃত্যু হয়েছে। তাঁর শরীরে কোনো গুলির আঘাত ছিল না। তবে আথুকোরালার পুলিশ দেহরক্ষী গুলিতে মারা গেছেন। সূত্র : এএফপি, রয়টার্স ও আলজাজিরা।