ইউক্রেনের খারকিভ শহর রুশ বাহিনীমুক্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ। খারকিভ অঞ্চলের গভর্নর ওলেহ সিনিহুবোভ এই খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, শহরের বাসিন্দারা সবাই ঘরে ফিরছে। কিয়েভের এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি গণমাধ্যমগুলো। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত রুশ বাহিনীর কাছ থেকে সহস্রাধিক বসতি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

গত শুক্রবার উদ্ধার হওয়া ছয়টি বসতিসহ মোট দখলমুক্ত বসতির সংখ্যা ১০১৫টি। তবে এ বসতিগুলো কোন এলাকায় অবস্থিত, তা স্পষ্ট করেনি জেলেনস্কি। আগ্রাসন শুরুর আগে ইউক্রেন বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য রপ্তানি করত জানিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, কৃষ্ণ সাগরের বন্দরে রুশ অবরোধের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। এই অবরোধকে খাদ্য সংকট তৈরির জন্য মস্কোর ইচ্ছাকৃত কৌশলের অংশ বলে অভিহিত করেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, রুশ কর্মকর্তারা 'প্রকাশ্যে দুনিয়াকে হুমকি দিচ্ছে যে বহু দেশে দুর্ভিক্ষ হবে'।

পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ দিতে শিগগির আবেদন করতে যাচ্ছে ইউরোপের দুই দেশ ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। এ ব্যাপারে সতর্ক করে রাশিয়া বলেছে, ন্যাটোয় যোগ দিলে ওই অঞ্চলে ব্যাপক 'সামরিকায়ন' হবে। রুশ সীমান্তের কাছে ন্যাটো পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করলে মস্কো অবশ্যই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। এ প্রসঙ্গে রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার গ্রুশকো বলেন, ন্যাটো তার নাগালের সবকিছুকেই সামরিকায়ন করতে চায়। নিশ্চিতভাবেই ন্যাটোর সম্প্র্রসারণ রাশিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।

ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দিলে রাশিয়া 'প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ' নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। এর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ফিনল্যান্ডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে রাশিয়া। ফিনল্যান্ডে রুশ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রাও (আরএও) নর্ডিকের একজন কর্মকর্তা এ খবর নিশ্চিত করেছেন। যদিও কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ফিনল্যান্ড আগে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পাওনা মূল্য পরিশোধ করেনি। এদিকে ন্যাটোতে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের যোগ দেওয়ার পরিকল্পনার বিপক্ষে মত দিয়েছে তুরস্ক। উল্লেখ্য, ফিনল্যান্ডের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘ ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো দেশটির এক সেনার যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। নিরস্ত্র এক বেসামরিককে হত্যার অভিযোগে ভাদিম শিশিমারিন নামে ২১ বছর বয়সী এক রুশ সেনাকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। ইউক্রেন বলেছে, শিশিমারিন ছাড়াও তারা রাশিয়ার হাজারও সেনার 'সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ' শনাক্ত করেছে।

ইউক্রেনের সেনাপ্রধানের একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, খারকিভ শহর নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে ইউক্রেন জয়ী হয়েছে। রুশ সেনাদের এখন মূল লক্ষ্যই হয়ে দাঁড়িয়েছে খারকিভ শহরে থাকা তাদের সেনা ইউনিটের প্রত্যাহার নিশ্চিত করা। রুশ বাহিনী পিছু হটছে দাবি করে গভর্নর ওলেহ সিনিহুবোভ বলেন, পরিস্থিতি এখনও গুরুতর এবং যারা আবার ঘরে ফিরতে চাচ্ছেন, ফেরার আগে তাঁরা যেন নিজেদের সুরক্ষার কথা ভাবেন। রুশ সেনারা অঞ্চলটিতে বহু মাইন পুঁতে রেখেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা বলেছেন, খারকিভ শহরটি এখন পুরোপুরি নিশ্চুপ। এটির আশপাশের এলাকায় মস্কো এখনও বোমাবর্ষণ করে চলেছে। এদিকে রাশিয়ার গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত শুক্রবারও খারকিভের একটি অস্ত্রাগারে হামলা করেছে রুশ বাহিনী।

পশ্চিমা সামরিক বিশ্নেষকরা বলছেন, ইউক্রেনীয় বাহিনীর পাল্টা হামলায় রুশ বাহিনীর পিছু হটার মাধ্যমে চলমান যুদ্ধের গতিবেগ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, অগ্রসর হওয়া রুশ বাহিনীর অবস্থান ধরে রাখা এখন অনেকখানি ঝুঁকির মুখে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে রুশ বাহিনী খারকিভ শহর থেকে তাঁদের সেনাদের সরিয়ে নিচ্ছে। বিশ্নেষকরা অনুমান করেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রধান একটি লক্ষ্য ছিল খারকিভ দখল করা। কিন্তু মস্কো তা করতে ব্যর্থ হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার পাশাপাশি উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে স্থল অভিযান শুরু করেছিল রাশিয়া। সূত্র :এএফপি, রয়টার্স, আরটি ও বিবিসি।