সারিন্দা নিয়ে প্রবাদ রয়েছে 'আমি কই কি, আমার সারিন্দা বাজায় কি।'  প্রবাদটির অর্থ হলো- কথায় ও কাজে মিল নেই। অর্থাৎ আমরা যা বলি তার সঙ্গে কাজের মিল নেই। প্রবাদটি সকলের কাছে পরিচিত হলেও যে বাদ্যযন্ত্রটি নিয়ে এটি রচিত সেই 'সারিন্দা' যন্ত্রটি সকলের কাছে অনেকটা অপরিচিত। কালের বিবর্তনে এটি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এর প্রধান কারণ প্রথমত তৈরিকারকের অভাব, দ্বিতীয়- বাদকের অভাব। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে ময়মনসিংহে তিনদিন ব্যাপী প্রাচীন সব সারিন্দা নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম।

ময়মনসিংহ নগরীর টাউনহল এলাকায় মিউজিয়ামে তিনদিনব্যাপী এই আয়োজনের সঙ্গে রয়েছে পুঁথি পাঠ, বাউল বৈঠক,  শিশুদের সংগীত ও যন্ত্রসংগীত। আয়োজনটির সঙ্গে সমন্বয়করী হিসেবে কাজ করছে জয়িতা অর্পা ও শৈল্পিক নির্দেশনায় জাওয়াতা আফনান। তিনদিন ব্যপী আয়োজনের সহোযোগিতায়  রয়েছে নোভিস ফাউন্ডেশন ও ময়মনসিংহ বাউল সমিতি। প্রদর্শনী প্রতিদিন সকাল ১২টা থেকে রাত ৮টা সকলের জন্য উম্মুক্ত। বুধবার থেকে শুরু হবে প্রাচীন সারিন্দার প্রদর্শনী।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব সারিন্দা পাওয়া যায় তা সাধারণত ছুতার বা কাঠ মিস্ত্রির দ্বারা বাদকের নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি। কেউ কেউ আবার নিজের সারিন্দা নিজেই বানিয়ে নিতেন কুড়াল, খুন্তা, বাইশা, বাটাল দিয়ে। সেক্ষেত্রে মনপবন, নিম, চন্দন, লোহা,  শাল, বৈলাম ও মেহগিনি কাঠ ব্যবহার করা হতো। 


এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম আয়োজনে প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে সংগ্রাহক রেজাউল করিম আসলামের সতের শতাব্দী থেকে উনিশ শতাব্দীর সংগৃহীত সারিন্দা। যার মধ্যে রয়েছে পাটগ্রাম, বুড়িমারি, কুড়িগ্রামের রহমান ফকির (৭৫) থেকে পাওয়া ৩৬৫ বছরের পুরোনো কালীররহাট, লালমনিরহাটের গুনধর বাবুর কাছ থেকে পাওয়া ৩০০ বছরের পুরানো সারিন্দা, দেবীরপাট, দূর্গাপুর, লালমনিরহাটের মনা সাধুর কাছ থেকে পাওয়া ২৫০ বছরের পুরানো সারিন্দা। এছাড়া ময়মনসিংহের গৌরীপুরের নাও ভাঙার চরের মোক্তার হোসেন ফকিরের (৫১) কাছ থেকে পাওয়া চার প্রজন্মের ব্যবহৃত দুইশ বছরের পুরোনো সারিন্দা। যেটি ব্যবহার করতেন মোক্তার ফকিরের বাবা রমজানী আলী ফকির। হালুয়াঘাট থেকে কীর্তিনিয়া মনীন্দ্র ওস্তাদজীর ব্যবহৃত ১৫০ বছরে পুরানো সারিন্দাও রয়েছে।

রেজাউল করিম আসলাম মূলত বাদ্যযন্ত্র সংগ্রাহক। তার সংগ্রহে রয়েছে লুপ্তপ্রায় বিলুপ্ত ও চলমান প্রায় ৬০০ বাদ্যযন্ত্র। তিন পুরুষ ধরেই এই বাদ্যযন্ত্র বেচাবিক্রির সঙ্গে জড়িত আসলামের পরিবার। ময়মনসিংহ শহরের দূর্গাবাড়ি সড়কে রয়েছে 'নবাব এন্ড কোং' নামে আসলামের একটি বাদ্যযন্ত্রের দোকান। ১৯৪৪ সালে দাদা নবাব আলী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা শুরু করেন। আসলামের দাদার পর তার বাবা জালাল উদ্দিন ব্যবসার হাল ধরেন। ছোটবেলা থেকেই লোকজ বাদ্যযন্ত্রর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় রেজাউল করিম আসলামের। পরে ২০০৬ সাল থেকে শুরু করেন বিরল বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ। সংগ্রহের পাশাপাশি রেজাউল করিম আসলাম এসব নিয়ে গবেষণাও করছেন। হারিয়ে যাচ্ছে যে যন্ত্রগুলো, কারিগরদের দিয়ে ওই যন্ত্রের আদলে নতুন করে আবার বাদ্যযন্ত্র তৈরি করার কাজও করছেন তিনি।

প্রর্দশনী নিয়ে রেজাউল করিম আসলাম বলেন, তৈরিকারক, বাদক, উপকরণ সবই হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় সারিন্দা ছিল খুবই মুল্যবান। যারা বাজাতো তারাও ছিলেন মরমি লোক। এগুলো হারানো বা নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই উদ্যোগ। এই সারিন্দা কারও রান্নাঘর, কারও গোয়ালঘর থেকে পাওয়া গেছে।  যাদের কাছে পাওয়া গেছে তারা জানে না এর ঐতিহাসিক বা ঐতিহ্যগত মূল্য কত। অনেক সারিন্দা চুলার লাকড়ি বা মাটিতে মিশে শেষ হয়ে গেছে। এই প্রদর্শনী থেকে যদি কেউ জানতে পারে তাহলে আমাদের পুরাতুন সারিন্দাগুলো বিলুপ্ত হবে না। আর নতুন প্রজন্মের কাছে এই দেশীয় যন্ত্রটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হবে।

প্রদর্শনী সম্পর্কে জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালার উপ-কীপার মুকুল দত্ত বলেন, এই ধরনের আয়োজন আরও বেশি হওয়া উচিত। তাহলে বার্তাটি সকলের কাছে পৌঁছালে আমাদের লোকজ সম্পদ ও লোকজ ঐতিহ্য রক্ষা পাবে।