স্টেফি গ্রাফ। রেকর্ড ৩৭৭ সপ্তাহ ছিলেন র‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর আসনে। জিতেছেন রেকর্ড ২২টি গ্র্যান্ডস্লাম একক শিরোপা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমীলা টেনিস তারকার সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার গল্প বের করে এনেছেন শাহনেওয়াজ টিটু

এগারো বছর বয়সে আমার ক্যারিয়ার শুরু হয় লিভিং রুমে। সোফা সরিয়ে, সেগুলো নেট বানিয়ে খেলতাম আমরা। বাবা আমার দিকে বল ছুড়ে মারতেন, আর আমি হিট করতাম। এভাবে টেনিস খেলোয়াড় হয়ে ওঠার পথে ঘরের অনেক আসবাবপত্র ভেঙে ফেলেছি আমি! চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড় হয়ে ওঠার পেছনে আমার জাতীয়তাবোধ আমাকে বেশ প্রেরণা জুগিয়েছে। আমার দেশের অন্য খেলোয়াড়রা জুগিয়েছেন সহায়তা। রোল মডেলরা তো বাচ্চাদের, বিশেষ করে মেয়েদের খেলায় প্রেরণা জোগায়; আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

সেন্টার কোর্টের দেখা
টেনিসের সবচেয়ে সম্মানজনক আসর 'উইম্বলডন' জিতেছি আমি সাতবার। সেন্টার কোর্টটির দেখা যখন প্রথম পাই, তখন বয়স আমার ১১ কি ১২ বছর। এ নিয়ে আমি বেশ রোমাঞ্চিত ছিলাম। যদিও খেলতে নেমে দেখলাম, মাঠটি বেশ ছোট; অথচ টিভিতে কতই-না বড় দেখাত! উইম্বলডনে আমি প্রথমবার খেলি ব্রিটিশ খেলোয়াড় জো ডুরি ও আমার মায়ের সঙ্গে। এ মাঠের নিয়ম অনুসারে আমাকে স্কার্ট পরেই খেলতে হয়েছিল তখন। কিন্তু স্কার্ট পরতে ভালো লাগত না আমার; বরং শর্টস পরতেই স্বস্তিবোধ করতাম।

পরাজয় থেকে শিক্ষা
সেদিন সেন্টার কোর্টে খেলতে নেমে আমি হেরে গিয়েছিলাম। মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার। জো তখন আমার পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। ক্যারিয়ারের একদম শুরুতেই আমি জেনে গিয়েছিলাম, আপনি যদি হেরে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়তে পড়তে দেখেন- আপনার প্রতিপক্ষ উচ্ছ্বাস করছে, তখন আপনার উচিত হবে নিজের আবেগকে সংযত রেখে এই পরাজয় থেকে শিক্ষা নেওয়া।

উপভোগ করেছি খেলা
ক্যারিয়ার শেষে পেছন ফিরে দেখি, টেনিস আমাকে সবই দিয়েছে। ফলে কোনো অনুতাপ নেই আমার। যদিও খেলাধুলাতেও নারী-পুরুষ বৈষম্য রয়েছে; নারী খেলোয়াড়রা পুরুষদের তুলনায় বেশ কম টাকাই পায়; তবু এ ব্যাপারটি আমাকে বিরক্ত করেনি। কেননা, ওদের তো খেলতে হয় পাঁচ সেট, আর আমাদের তিন সেট। ফলে ওরাই বেশি প্রাপ্য। আর টাকার বিষয়টি কখনোই আমার কাছে প্রাধ্যান্য পায়নি; বরং খেলাটি উপভোগ করে গেছি প্রতিমুহূর্তে।

নতুন চ্যালেঞ্জের সময়
আমি মনে করি, টেনিস খেলার সময় একজন খেলোয়াড়ের উচিত শুধু পয়েন্টের দিকে মনোযোগ দেওয়া; আর এ কাজটি বেশ ভালোভাবেই আমি করতে পারতাম বলে আমার বিশ্বাস। আমি খুবই সৌভাগ্যবান, আমার দুটি সুস্থ ও চমৎকার সন্তান রয়েছে- টেনিস ছাড়ার পর তাদের আমি সময় দিতে পারছি। তা ছাড়া টেনিস আমাকে যা দিয়েছে, তাতে বেশ আয়েশের জীবন কাটিয়ে দেওয়ার সৌভাগ্য আমার রয়েছে। তবু খেলতে গিয়ে যে দর্শনের দেখা আমি পেয়েছি, সেটি মন থেকে এতটুকুও বিতাড়িত করিনি। ফলে এখনও সব কাজেই সেই একই কঠোর পরিশ্রমী মানুষ রয়ে গেছি আমি। আর যেহেতু টেনিস ছেড়েছি, ফলে সময় হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার।

চিলড্রেন ফর টুমরো
টেনিস ক্যারিয়ারের দিনগুলোতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভ্রমণের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। নিজের চোখে দেখেছি- যুদ্ধ, সহিংসতা, নির্বাসন কিংবা পরিবার হারানোর মধ্য দিয়ে কত কত শিশু কী নিদারুণভাবে জীবনের প্রতিটি দিন কাটাচ্ছে। ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে আমি শিখেছি, শিশুদের দেহের অদেখা ক্ষত যদি সারিয়ে তোলা না যায়, তাহলে তা ভবিষ্যতে তাদের মনে কতটা ভয়াবহ দুর্ভোগ নিয়ে আসতে পারে। ফলে ১৯৯৮ সালে 'চিলড্রেন ফর টুমরো' [www.children-for-tomorrow.comনামে সংস্থাটি আমি গড়ে তুলি শিশুদের প্রয়োজনীয়তার ওপর নজর দিতে এবং স্পেশালাইজড থেরাপির মাধ্যমে তাদের রোগব্যাধি সারিয়ে তুলতে। এই শিশুদের একটা সুস্থ ভবিষ্যতের সুযোগ করে দিতেই আমাদের এই সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার
মা-বাবার চুম্বন, স্বামীর চুম্বন, সন্তানদের চুম্বন আমার জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। আর আমি মনে করি, একেকটা নতুন দিন একেকটা নতুন সুযোগ নিয়ে এসে দাঁড়ায় মানুষের দোরগোড়ায়। মানুষকে স্রেফ সেটি কাজে লাগাতে হয়। আমি জানি, যে পৃথিবীতে আমার সন্তানরা বেঁচে আছে, এমন পৃথিবীতে তাদের রাখার ভাবনা আমি ভাবিনি কখনোই। বরং পৃথিবীর সব শিশুর জন্য একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্নই আমি দেখতাম, এখনও দেখি।