উনিশ বছর পর ভোটাভুটির মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ পেয়েছিল চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবলীগ। পছন্দের প্রার্থীকে প্রিয় সংগঠনের নেতৃত্বে আনতে মুখিয়ে ছিলেন ২৪৬ কাউন্সিলর। তাঁদের সব আশা হলো গুড়ে বালি। ভোট ছাড়াই এখন কেন্দ্রীয় নেতাদের পছন্দে হবে উত্তর জেলার কমিটি। হতাশার একই রকম মঞ্চ তৈরি হয়ে আছে চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলাতেও। মহানগরে নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ৭৭৮ কাউন্সিলর। দক্ষিণে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি ২৫০ কাউন্সিলর। অথচ তিন সাংগঠনিক জেলাতেই ভোটের জন্য প্রস্তুত ছিলেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আগ্রহী ২০৮ প্রার্থীও। তবুও তৃণমূলের চাওয়া পূরণ হয়নি চট্টগ্রামে। তাঁদের হারতে হয়েছে 'ভাই লীগে'র কাছে। সম্মেলন হলেও পছন্দের প্রার্থীকে নেতৃত্বে আনতে 'ভাই লীগে'র অদেখা চাপ ছিল কেন্দ্রীয় কমিটির ওপর। তাদের পছন্দের ব্যক্তি কমিটিতে না এলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার শঙ্কাও ছিল চট্টগ্রামে। তাই আর ঝুঁকি নেননি যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। তবে সম্মেলনে 'ভাই লীগ'কে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে গেছেন তাঁরা।

'ভাই লীগে'র রাজনীতি না করতে নিখিলের হুঁশিয়ারি :মহানগর যুবলীগে বিবাদের জন্য চট্টগ্রামের প্রভাবশালী দুই আওয়ামী লীগ নেতা শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে দায়ী করেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। দুই নেতার উদ্দেশে সোমবার মহানগরের সম্মেলন মঞ্চেই তিনি বলেন, 'এখানে থাকা নেতারা সবাই ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। এরপরও আমার চেয়ারম্যান লজ্জা পান, আমরা লজ্জা পাই, কষ্ট পাই। কেন জানেন? আমরা দেখতে পাই, এখানে নাছির ভাইয়ের নাম নিলে একপাশ থেকে স্লোগান হয়, নওফেল ভাইয়ের নাম নিলে অন্যপাশ থেকে স্লোগান হয়। নেতাদের মধ্যে ঐক্য না এলে কর্মীদের মধ্যে একতা আসবে না।' নাছির ও নওফেল-বলয়ে না ঘুরে শেখ হাসিনার আদর্শে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে নেতাকর্মীদের পরামর্শ দেন তিনি।

'ভাই লীগে'র চাপ ছিল উত্তর-দক্ষিণেও :চট্টগ্রাম মহানগরের মতো 'ভাই লীগে'র চাপ ছিল উত্তর ও দক্ষিণ জেলাতেও। উত্তর জেলাতে পছন্দের প্রার্থী ছিল তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালামের। এঁদের দোয়া ও আশীর্বাদ নিয়ে এবার প্রার্থী হয়েছেন অনেকেই। উত্তর জেলায় যাঁরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের বেশিরভাগ পোস্টার ও ব্যানারে এই তিন নেতার ছবি ব্যবহার করেছেন। একইভাবে দক্ষিণ জেলাতে 'বড় ভাই' হিসেবে ছবি বেশি ব্যবহূত হয়েছে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও মোসলেম উদ্দিন আহমেদ এমপির। তাঁদের দু'জনের পছন্দের প্রার্থী ছিল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের তালিকায়। দক্ষিণ জেলাতে এ দু'জনের কাছের মানুষ ছিলেন যুবলীগের বর্তমান সভাপতি আ ম ম টিপু সুলতান চৌধুরী। তিনি এবার সভাপতি পদে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেননি। তারপরও সম্মেলনের দিন মৌখিক ইচ্ছায় সভাপতি পদে নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করেন তিনি। নেতাকর্মীদের ইচ্ছায় তিনি এভাবে প্রার্থী হয়েছেন বলে সমকালকে জানিয়েছেন। ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও মোসলেম উদ্দিন এমপির সমর্থন নিয়েই তিনি জীবনবৃত্তান্ত জমা না দিয়েই প্রার্থী হয়েছেন বলে জানান। নিয়ম না মেনে তাঁর এমন আগ্রহে অসন্তোষ আছে অন্য প্রার্থীদের মনে।

হতাশ তৃণমূলের ১২৭৪ কাউন্সিলর :চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল ৭৭৮ কাউন্সিলরের। নগরের ৪০, ৪১, ২৮, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে হয়েছে যুবলীগের কমিটি। এসব ওয়ার্ড থেকে ২৫ জন করে মোট ১২৫ কাউন্সিলর ভোট দিতে এসেছিলেন সম্মেলনে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকা যুবলীগের বাকি ৩৮টি সাংগঠনিক ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে কাউন্সিলর এসেছিলেন ৫৫৩ জন। নগর যুবলীগের বর্তমান কমিটিরও ১০০ জন দিতে পারতেন ভোট। ১০ বছর পর হওয়া সম্মেলনে এমন সুযোগ আসায় সবাই ছিল চাঙ্গা। শেষমেশ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার আফসোস নিয়েই ফিরতে হয়েছে তাঁদের। ২০১৩ সালের ৯ জুলাই ৯০ দিনের জন্য নগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

একইভাবে হতাশ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় থাকা আট উপজেলার ২৫০ কাউন্সিলর। ১২ বছর পর এবার সম্মেলন হয়েছে এই সাংগঠনিক জেলাতে। সর্বশেষ ২০১০ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি হয় দক্ষিণ জেলা যুবলীগে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবলীগের সম্মেলন হয়েছে ১৯ বছর পর। ২০০৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর উত্তর জেলা যুবলীগের সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল।

হতাশ ২০৮ প্রার্থীও :চট্টগ্রামের তিন সাংগঠনিক ইউনিটে ছয়টি শীর্ষ পদের বিপরীতে এবার জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়ে ২০৮টি। এর মধ্যে নগরে জমা পড়ে ১০৮টি। তাতে দেখা যায়, সভাপতি পদে ৩৫ আর সাধারণ সম্পাদক পদেই ৭৩। তবে সম্মেলনের দিন সভাপতি পদে ৩৩ জন আর সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন ৬৫ জন। অন্যদিকে, উত্তর জেলায় সভাপতি পদে ৯ জন, সাধারণ সম্পাদক পদে ২২ জনসহ মোট ৩১ জন জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন। তবে সম্মেলনের দিন সভাপতি পদে সাতজন ও সাধারণ সম্পাদক পদে আগ্রহী ছিলেন ২১ জন। দক্ষিণ জেলায় সভাপতি পদে ১৩ জন ও সাধারণ সম্পাদক পদে ৪২ জন টিকে ছিলেন সম্মেলনের দিন পর্যন্ত।

কে কী বললেন :ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত না হওয়ায় হতাশ উত্তর জেলার সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, 'এবার যে পরিবর্তন দেখেছি, তাতে ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত হবে বলে ধারণা করেছিলাম। সব প্রস্তুতিও শেষ করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েছি।' আরেক প্রার্থী জয়নাল আবেদীন বলেন, 'তৃণমূলকে হতাশ করে ঢাকায় কমিটি ঘোষণার সিদ্ধান্তে তেমন অবাক হইনি। কারণ, এখানে কমিটি ঘোষণা করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত। যারা ভাই লীগ করে, তারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করত।' নগরে সভাপতি পদের প্রার্থী মোহাম্মদ সাজ্জাত হোসেন বলেন, 'রাজনীতি এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ভাই লীগ। যাঁদের অঢেল টাকা আছে, তাঁরা থাকেন আলোচনায়। আর যাঁদের টাকা নেই, তাঁরা থাকেন চিপায়।' দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম বলেন, 'অনেক বছর পর সম্মেলন হয়েছে। এ কারণে এবার প্রত্যাশাটাও ছিল বেশি। তবে ভোট না দিতে পেরে হতাশ সবাই।'