প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশগুলোতে ম্যারাথন সফরে আছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। তার এই সফরকে এই অঞ্চলের ১০ দ্বীপ দেশের সঙ্গে বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা চুক্তি করতে বেইজিংয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত হিসেবে মনে করা হয়। 

এই উচ্চাভিলাষী চুক্তিতে ব্যাপক বিস্তৃত ইস্যু অন্তর্ভুক্ত। চুক্তিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা থেকে শুরু করে চীনা ফান্ডিংয়ে পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি স্থাপন এবং চীনা সংস্কৃতির যোগসূত্র তৈরির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মানে হলো বেইজিং এই অঞ্চলের দেশগুলোরে সঙ্গে আরও বেশি ঘনিষ্ট হতে চায়। কিন্তু চলতি সপ্তাহে দেখা গেল, অঞ্চলটির অনেক দেশ চুক্তিটিতে রাজি নয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষর না করায় চীনের চুক্তির ওই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। দেশগুলো চুক্তির নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কথা হলো, এই চুক্তি না হওয়ার মধ্য দিয়ে কী প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বাধা পড়লো বা ধাক্কা খেল-অন্তত ঠিক এই মুহূর্তের জন্য?

দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে 

অনেক আগে থেকেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশগুলোর দিকে চীনের নজর ছিল। ২০০৬ সালের পর থেকেই দেশটি এই অঞ্চলে ধীরে ধীরে বাণিজ্য, অনুদান, কূটনৈতিক এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাড়াতে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার লোই ইনস্টিটিউটের সূত্রমতে, ২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঋণ এবং বিভিন্ন ধরনের অনুদানসহ বেইজিং এই অঞ্চলে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বৈদেশিক সহায়তা দিয়েছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন কারণ এই অঞ্চল নিয়ে চীনকে আগ্রহী করে তুলে। লোই ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক মিহাই সোরা বলেন, ঐতিহাসিকভাবে, সংঘাতের সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ভৌগলিকগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এই অঞ্চলের মাধ্যমেই সাপ্লাই এবং অ্যাকসেস নিয়ন্ত্রণ করা যায়। 

তিনি বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা মানে হলো আপনার এমন একটি আঞ্চলিক ব্লক আছে যা জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে, বিভিন্ন ইসুতে গৃহীত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আপনার অবস্থানকে অনেক বেশি সহানুভূতিশীল করে তুলতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং গত সপ্তাহে ফিজি সফর করেন। ছবি: বিবিসি অনলাইন

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশগুলোর দিকে চীনের এই আগ্রহ তাইওয়ানের প্রতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থন কমানোর দীর্ঘ দীনের প্রচেষ্টারও অংশ। তিনি উল্লেখ করেন, গত কয়েক বছরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় বেশ কয়েকটি দেশ তাদের কূটনৈতিক স্বীকৃতি তাইওয়ান থেকে সরিয়ে চীনের দিকে গেছে। 

সর্বশেষ বিষয় হলো সম্পদ। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সম্পদের প্রধান ক্রেতা হলো চীন এবং দেশটির উন্নয়নের জন্য এই সম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই সম্পদে আরও ভালোভাবে প্রবেশ নিশ্চিত করাও চীনের কাছে অগ্রাধিকারের বিষয়।  

কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের এই আগ্রহে অস্ট্রেলিয়ার উদ্বেগ বৃদ্ধি করেছে। কারণ অস্ট্রেলিয়া ঐতিহ্যগতভাবে এই অঞ্চলকে নিজেদের ‘ব্যাকইয়ার্ড’ (পেছনের দিকের উঠোন) বিবেচনা করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যানবেরা চীনের প্রভাব কমাতে এই অঞ্চলে সহায়তার পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে। ২০১৮ সালে এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হতে অস্ট্রেলিয়া ‘প্যাসিফিক অগ্রগতি’ নীতি ঘোষণা করে। এ ছাড়াও দেশটি কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো তহবিলের যোগান দেওয়া শুরু করেছে। যা এই অঞ্চলে চীনের ঋণ এবং ব্যয়ের পাল্টা উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। 

কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে চীন সলোমন দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই সময় এই চুক্তি স্বাক্ষরকে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি প্রশান্ত মহাসারগরীয় অঞ্চলে দেশটির ৮০ বছরের অস্ট্রেলিয়ান পররাষ্ট্র নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যর্থতা বলে আখ্যা দিয়েছিল। 


চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই অঞ্চলে সফরে আছেন। কাকতালীয়ভাবে গত সপ্তাহেই অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং ফিজি সফর করেছেন। তাদের সফর সংশ্লিষ্ট এই কাকতালকে উক্ত অঞ্চলকে ঘিরে দেশ দুটির মধ্যকার প্রতিযোগিতারই ইঙ্গিত। 

চুক্তিটি ‘আঞ্চলিক শৃঙ্খলায় পরিবর্তন আনতে পারতো’

সোরা বলেন, স্বাক্ষর না হওয়া ওই চুক্তিটির মাধ্যমে আঞ্চলিক শৃঙ্খলা পরিবর্তনের সম্ভাবনা ছিল। 

খসড়া ওই চুক্তির ফাঁস হওয়া সংস্করণে দেখা যায়, চুক্তি হলে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে কার্যক্রম বৃদ্ধি করতো চীন। এই কর্মকাণ্ডে আর্থিক সহায়তা থেকে পুলিশকে প্রশিক্ষণ এবং চীন-প্যাসিফিক ফ্রি ট্রেড জোনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

ম্যাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র লেকচারার আন্না পাওয়েলস বলেন, আঞ্চলিক পুলিশিংয়ের ব্যাপারে প্রস্তাবিত সহযোগিতার বিষয়টি আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থাপত্য তৈরি এবং অনুসরণে বেইজিং যে আগ্রহী সেটি প্রমাণ করে। তবে এটা পরিষ্কার না যে, তা বিদ্যমান নিরাপত্তা স্থাপত্যের সঙ্গে কিভাবে খাপ খাওয়াতো এবং যুক্ত হতো। 

তিনি আরও বলেন, উল্লেখিত সাইবার সিকিউরিটির বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ বাড়ায়। 

তিনি বলেন, যদি চুক্তিটি স্বাক্ষর হতো তাহলে এটি এমন এক সহযোগিতার দিকে নিয়ে যেত যা প্রকৃতই এই অঞ্চলে বিদ্যমান সম্পর্ককে জটিল করে তুলতো। বিশেষ করে যাদের অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। 

চুক্তিটির ব্যাপারে প্রশান্ত মহাসাগরীয় কয়েকটি দেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।  ফেডারেটেড স্ট্যাট অব মিক্রোনেসিয়া (এফএসএম) বলেছেন, প্রস্তাবটি ‘অসৎ’ এবং এটি সরকার এবং প্রধান প্রধান শিল্পে তার আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ওপর চীনের প্রভাব নিশ্চিত করতো। 

আন্না পাওয়েলস বলেন, ফিজি, সামোয়া, নিউই, এফএসএম এবং পালাউর পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে এটা নিশ্চিত যে, চুক্তিতে সম্মতির ব্যাপারে দেশগুলোর বেশ শক্ত উদ্বেগ ছিল। এর সরাসরি ফল হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো চুক্তি থেকে বিরত থেকেছে। 

গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির ড. টেস নিউটন কেইনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঠিক সময়ে ফিজি সফর এবং এই অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার প্রভাব ধরে রাখার প্রত্যয় কী চীনের সঙ্গে চুক্তিটি না হওয়ায় কোনো প্রভাব রেখেছে। উত্তরে তিনি বলেন, না। এটা ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় সার্বভৌমত্ব এবং এই অঞ্চলের দ্বীপ দেশগুলোর সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ফসল। 

বিশ্লেষক মিহাই সোরাও কেইনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো দেশের চাপের ফলে এই সিদ্ধান্ত ছিল না। এই চুক্তি সামনে আসায় হয়তো এটা প্রমাণ হয়েছে যে, চীন এই অঞ্চলকে যথেষ্ঠ সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেনি এবং তাতে এই অঞ্চলের উদ্বেগের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল না। 

সলোমন দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে ইতোমধ্যে চীন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ছবি: বিবিসি অনলাইন

তিনি বলেন, চীন দেশগুলোকে কথা বলার তেমন সুযোগ না দিয়েই এই প্রস্তাব উপস্থাপনের মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক আলোচনা চেয়েছিল। মনে হচ্ছে তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। 

এখন কী হবে?

ড. পাওয়েলস বলেন, এটা আঞ্চলিক পর্যায়ে চীনের কূটনৈতিক তৎপরতার ব্যর্থতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। তবে আমরা আশা করতে পারি চীন এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রতিশ্রুতিশীল হবে। 

মিহাই সোরা পাওয়েলসের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ওয়াং ই এই সফরে বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন এবং সফর সম্পূর্ণ হওয়ার আগে আরও চুক্তি করতে চাইবেন। 

চুক্তি স্বাক্ষর ব্যর্থ হওয়ার খবর চাউর হওয়ার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে এক বিবৃবিতে চীন বলেছে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব গভীর করতে তারা এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 

এই ব্যাপারে নিউটন কেইন বলেন, বৈঠকের পরপরই তাৎক্ষণিক চীনের ওই বিবৃতি এটা প্রমাণ করে যে, বহুপাক্ষিকভাবে কাজ করারটা তাদের কাছে একটি ব্যাপার এবং তারা তা অনুসরণ করতে চায়। আর এই আলোচনাটি চীন চালিয়ে যেতে চায়।

ওই বিবৃতিতে এই অঞ্চলের জন্য চীনের একটি প্রস্তাবের বিস্তৃত তালিকাও দেওয়া হয়। যেখানে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে বিভিন্ন ধরনের অনুদানের পদক্ষেপ এবং তাৎক্ষণিক যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন ফোরাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এটিই বেইজিংয়ের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ঘিরে উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। 

সোরা বলেন, আমি মনে করি এটা স্পষ্ট ব্যাপার যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন যা চেয়েছিল তার চেয়ে বেশি পেয়েছে। তবুও এই অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তা উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করার চীনের দীর্ঘদিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়ে যাবে। 

সূত্র: বিবিসি অনলাইন