মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ব্যবসা সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পাওয়া যে ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সি পেতে যাচ্ছে, তার তিনটির মালিক তিন এমপি। একটির মালিক এক মন্ত্রীর স্ত্রী। দুই এমপির এজেন্সি ব্যবসায় নতুন হলেও কর্মী পাঠানোর কাজ পেতে যাচ্ছে।

যে ২৫ এজেন্সি নিয়ে সিন্ডিকেট হচ্ছে তার তালিকা পেয়েছে সমকাল। মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমেও (এফডব্লিওসিএমএস) তালিকাটি ছিল। যদিও সম্প্রতি তা মুছে ফেলা হয়েছে।

তালিকায় রয়েছে ফেনী-২ আসনের সরকারদলীয় এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর প্রতিষ্ঠান স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেড (আরএল-১৫৫১)। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত মাত্র ৯১ জন কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছে। ঢাকা-২০ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি বেনজির আহমদের প্রতিষ্ঠান আহমদ ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১১৪৬) সাত বছরে মাত্র ৩৮৭ জন কর্মী বিদেশ পাঠিয়েছে।

তালিকায় রয়েছে ফেনী-৩ আসনের এমপি ও সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (আরএল-১৩২৭)। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী কাশমেরী কামালের অরবিটাল ইন্টারন্যাশনালও (আরএল- ১১৩) রয়েছে। জনশক্তি ব্যবসায় অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানটি ১৫ হাজার ৮৮৫ জন কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছে।

প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে বাতিল হওয়া জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতেই এবারও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে মালয়েশিয়া। ওই পদ্ধতিতে ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে পৌনে তিন লাখ কর্মী নিয়োগ করে দেশটি। আগেরবারের ছয় এজেন্সি বাদ পড়েছে। বাকি চারটির একটি ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-৫৪৯) এবারও রয়েছে। অবশিষ্ট তিনটি এসেছে ভিন্ন নামে।

ক্যাথারসিসের মালিক রুহুল আমিন স্বপন জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব। সিন্ডিকেটবিরোধী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগেরবারের মতো এবারও রুহুল আমিন স্বপনই মূল নিয়ন্ত্রক। যদিও বরাবরই এ অভিযোগ নাকচ করেছেন তিনি।

গতবার সিন্ডিকেটে ছিল আল ইসলাম ওভারসিজ (আরএল-১০৬)। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জয়নাল আবেদিন জাফরের ছেলে রাশাদ আবেদিনের প্রতিষ্ঠান এসওএস ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস (আরএল-১৫৩০) এবারের সিন্ডিকেটে রয়েছে। জয়নাল আবেদিন জাফর সমকালকে বলেছেন. পড়াশোনা শেষে ছেলে ব্যবসার হাল ধরেছে। আগের সিন্ডিকেটে ছিল শানজারি ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-৭৪২)।

তার বদলে এবার এসেছে নিজাম হাজারীর স্নিগ্ধা ওভারসিজ। প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটসের (আরএল-৪৬৮) বদলে এসেছে অর্থমন্ত্রীর স্ত্রীর প্রতিষ্ঠান। সিন্ডিকেটের বাকি এজেন্সিগুলো হলো আবেদ এয়ার ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস (আরএল-১০২৪), আকাশ ভ্রমণ (আরএল-৩৮৪), আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-৩৫৪), আল বুখারি ইন্টারন্যাশনাল (আরএল- ৩০১), অ্যামিয়াল ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৩২৬), বিনিময় ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-৩৫১), বিএম ট্রাভেলস (আরএল-১৪২১), ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৫৭১), গ্রীনল্যান্ড ওভারসিজ (আরএল-৪০), ইম্পেরিয়াল রিসোর্স (আরএল-১৮৭৪), আরভিং এন্টারপ্রাইজ (আরএল-২১৫), ঐচি ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১১৪১), পাথ ফাইন্ডার (আরএল-১২৯৮), সরকার ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৭১৫), শাহীন ট্রাভেলস (আরএল-২১৪), সাউথ পয়েন্ট ওভারসিজ (আরএল-৬২২), ইউনাইটেড ম্যানপাওয়ার (আরএল-১২১৬), জাহারাত অ্যাসোসিয়েট (আরএল-২৮৫) এবং নিউএজ ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-৭০৩)

আগের সিন্ডিকেটে থাকলেও এবার বাদ পড়া রাব্বি ইন্টান্যাশনালের মালিক মোহাম্মদ বশির সমকালকে বলেছেন, আগেরবার কর্মী পাঠানোর নামে অনৈতিক ব্যবসা হয়েছে। এ কারণে তিনি এবার থাকেননি।

জিটুজি প্লাসে কর্মী প্রতি সরকার নির্ধারিত ব্যয় প্রথমে ছিল ৩৭ হাজার টাকা। পরে তা হয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। বাদ পড়া এক প্রতিষ্ঠানের মালিক সমকালকে বলেছেন, তিন থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। নামে ১০ এজেন্সির সিন্ডিকেট হলেও ব্যবসা ও মুনাফা করেছে তিন চারটি প্রতিষ্ঠান। বাকিরা অত্যাচারিত হয়েছে। লোকসান করেছে। সিন্ডিকেটের কলঙ্কের ভাগীদার হয়েছে।

এই মালিক জানান, চাহিদাপত্র আনলেও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রকদের ঘুষ না দিয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে পারেননি। কর্মী প্রতি পাঁচ হাজার ৩০০ রিঙ্গিত বা সোয়া এক লাখ টাকা করে দিতে হয়েছে। একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান থেকে ৭৫০ জন কর্মী নিয়োগের চাহিদা এনেছিলেন। তা নিয়ে যায় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রকরা।

অনিয়মের অভিযোগে ২০০৯ সালে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে মালয়েশিয়া। ২০১৫ সালে সমঝোতা স্মারক সই করে। জিটুজি প্লাস নামে পরিচিত ওই চুক্তি অনুযায়ী, দুই দফায় ৯৩০টি এজেন্সির তালিকা পাঠায় বাংলাদেশ। সেখান থেকে ১০ প্রতিষ্ঠানকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেয়। কীসের ভিত্তিতে কোন মানদণ্ডে এজেন্সি বাছাই করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা কখনও দেয়নি মালয়েশিয়া।

দেশটির তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ছিল বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনলাইন সিস্টেম নিয়ন্ত্রক। তার অংশীদার ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয় নাগরিক আমিন নুর। বলা হয়ে থাকে, তাকে ঘুষ দেওয়া এজেন্সিগুলোই ছিল সিন্ডিকেটে। এবারও তাই হয়েছে।

২০১৮ সালে মাহাথির মুহাম্মদ ক্ষমতায় ফিরে জিটুজি প্লাস বাতিল করেন। শ্রমবাজার খুলতে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর সমঝোতা স্মারক সই করেছে দুই দেশ। আবারও সিন্ডিকেটের প্রস্তাব আসে মালয়েশিয়া থেকে। গত ১৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম সারাভান প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদকে চিঠিতে জানান, ২৫ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করবে তার দেশ। প্রতিটি এজেন্সির অধীনে ১০টি করে সাব-এজেন্সি কর্মী পাঠাতে পারবে। এজেন্সি বাছাই করবে মালয়েশিয়ার সরকার।

১৭ জানুয়ারি ফিরতি চিঠিতে বাংলাদেশ জানায়, প্রতিযোগিতা আইনের কারণে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে পারে না বাংলাদেশ। সব প্রতিষ্ঠানকে সমান সুযোগ দিতে হবে। তবে গত বৃহস্পতিবার দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকে বাংলাদেশ রাজি হয়, এজেন্সি বাছাই করবে মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার মন্ত্রী বলেন, এজেন্সি বাছাই বাংলাদেশ নয়, মালয়েশিয়ার সরকারের বিষয়। যদিও অন্য বাকি ১৩ দেশ থেকে সব এজেন্সিই মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠায়।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ সিন্ডিকেটের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করে বলেছেন, বৈঠকে সিন্ডিকেট বা এজেন্সির সংখ্যা নিয়ে আলোচনা হয়নি। ১ হাজার ৫২০টি বৈধ এজেন্সির তালিকা পাঠাবে বাংলাদেশ। মালয়েশিয়া যেসব এজেন্সিকে বাছাই করবে, তারা কর্মী পাঠাবে।

জনশক্তি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এই বাছাইয়ের মাধ্যমেই সিন্ডিকেট হয়েছিল ২০১৫ সালে।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা সমকালকে নিশ্চিত করেছেন, ২৫ এজেন্সিই কর্মী পাঠানোর কাজ পেতে যাচ্ছে। আকাশ ভ্রমণ এজেন্সির মালিক ও মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিমের এই আওয়ামী লীগ নেতা মনসুর আহমেদ কালাম নিশ্চিত করেছেন, তার প্রতিষ্ঠান তালিকায় রয়েছে।

সিন্ডিকেট-বিরোধী ব্যবসায়ীদের নেতা বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী সমকালকে বলেন, ২৫ এজেন্সির অনেকগুলোর নামও তিনি শোনেননি। এমপি বেনজির আহমেদ বায়রার সাবেক সভাপতি হলেও তার প্রতিষ্ঠান কখনও বিদেশে কর্মী পাঠায়নি।

সিন্ডিকেটের তালিকায় রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম বাছেকের প্রতিষ্ঠা বিএম ট্রাভেলস লিমিটেড। তালিকায় থাকা ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল এখন পর্যন্ত মাত্র ৫২ জন এবং ইম্পেরিয়াল রিসোর্স মাত্র ৩২৪ জন কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছে। তারপরও কীভাবে তারা মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজ পেতে যাচ্ছে- এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ইম্পেরিয়ালের ম্যানেজার মেহেদি হাসান অফিসে দেখা করে কথা বলার অনুরোধ জানান।

বৃহস্পতিবার প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী জানান, কর্মীপ্রতি খরচ বা অভিবাসন ব্যয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকার কম হবে। মালয়েশিয়ার মন্ত্রী বলেছেন, শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের কথা। এজেন্সি নির্ধারিত ব্যয়ের বেশি টাকা নিলে এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইমরান আহমদ।

জিটুজি প্লাসে ১০ গুণ টাকা আদায় করা হলেও ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। ব্যবসায়ীদের সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, আগেরবার কর্মীপ্রতি ৫ হাজার ৩০০ রিঙ্গিত নেওয়া হয় চাহিদাপত্র আনার নামে। মালয়েশিয়ার এজেন্টরা নেয় সাড়ে ৫ হাজার রিঙ্গিত। এতে একটি ভিসার 'দাম' দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিমান ভাড়া, সরকারি ফিসহ কর্মীর পকেট থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা গেছে। সিন্ডিকেটের কারণে এবারও একই অনিয়মের শঙ্কা রয়েছে।

বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধিই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাই তারা চেয়েছিলেন সব এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাক।

সম্প্রতি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে চাপ দেওয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যমের খবর, দেশটিতে বিদেশি কর্মীর মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। ইন্দোনেশিয়াও কর্মী পাঠাচ্ছে না। মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ পদ্ধতি অনুমোদন করেনি। তারপরও বাংলাদেশ রাজি হয়েছে।

চাপের অভিযোগ নাকচ করে সিন্ডিকেটের পক্ষে যুক্তি দিয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, শ্রমবাজার খুলেছে, কর্মীরা যেতে পারবে- যা আসল অর্জন। ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, কর্মী গ্রামের দালাল হয়ে তিন-চার হাত ঘুরে এজেন্সিতে আসে। সে কারণেই ব্যয় বাড়ে।

গত দুই বছরে তিনজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে মালয়েশিয়া। সরকার বদল হলে অতীতের মতো চুক্তি বাতিলেরও শঙ্কা রয়েছে। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান সমকালকে বলেন, আগের মতো এবারও নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ ও অনৈতিক। অনিয়ম হয়েছিল বলেই ২০১৮ সালে শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছিল। অনৈতিক পদ্ধতির পুনরাবৃত্তিতে আবার একই পরিণতি হতে পারে।