আঠারো বছরের কম বয়সী সবাই শিশু হিসেবে বিবেচিত। সে হিসেবে দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশই শিশু। দেশের লোকসংখ্যার মোটামুটি অর্ধেক শিশু হলেও নানা কারণে তারা পাচ্ছে না আলোর দেখা। আছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে সেই মন্ত্রণালয়ে শিশুদের জন্য নেই তেমন গতিশীল কর্মকাণ্ড। ফলে শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, নির্যাতনের মতো অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না দেশ। কমছে না স্কুল-মাদ্রাসা থেকে শিশুদের ঝরে পড়ার হার। এমনকি সরকারের বাজেটেও শিশুদের বিষয়টি উপেক্ষিত। ফলে অবহেলায় পিছিয়ে পড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সারথিরা। এমন প্রেক্ষাপটে শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশে আলাদা শিশু অধিদপ্তর গঠনের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজন।

বিশিষ্টজন বলছেন, শিশুরা বিশাল এক জনগোষ্ঠী। সেই পটভূমিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট জাতীয় বাজেটে শিশুদের জন্য ৮০ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যা জাতীয় বাজেটের ১৫.৩৩ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৬৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। শিশুদের প্রতি বিনিয়োগ বাড়ানো সরকারের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়। এবারের ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪ হাজার ২৯০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। এর আগের ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৪ হাজার ১৯০ কোটি টাকা।

শিশুর মানবাধিকার লঙ্ঘিত :বাল্যবিয়ের ফলে কপাল পুড়ছে কন্যাশিশুদের। দেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে। ইউনিসেফ বলছে, বাল্যবিয়ের হারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ ছাড়া বর্তমান সময়ে আশঙ্কাজনক হারে পর্নোগ্রাফির ফাঁদে পড়ছে কন্যাশিশুরা। ২০২১ সালে সারাদেশে ৫২ কন্যাশিশু পর্নোগ্রাফির শিকার হয়েছে বলে জানায় জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম।

নেই দৃশ্যমান উদ্যোগ :শিশুর উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও তাদের তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অনুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন ৬টি, মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তরের ৯টি, জাতীয় মহিলা সংস্থার ৪টি এবং জয়িতা ফাউন্ডেশন বাস্তবায়নাধীন ২টিসহ মোট ২১টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ ছাড়া, দেশের ১৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শিশুর উন্নয়নে কাজ করছে সরকার। এর মধ্যে শিশুদের নিয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পের সংখ্যাও হাতেগোনা। এদিকে, মোট ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতাধীন দেশে মোট অধিদপ্তর ও অন্য অফিস রয়েছে ৩৫৩টি। অথচ শিশুদের উন্নয়নে এখনও শিশু অধিদপ্তরই প্রতিষ্ঠা পায়নি।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আক্তার জলি সমকালকে বলেন, 'মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনেক কাজ করতে হয়। নারীদের উন্নয়নে কাজ করার জন্য নারী বিষয়ক অধিদপ্তর রয়েছে, তবে শিশুদের জন্য নেই কোনো অধিদপ্তর। অধিদপ্তর না করলে একটা মন্ত্রণালয়ের আওতায় কাজ করা অনেক কঠিন। কারণ শিশুদের উন্নয়নের বিষয়গুলো দেখভালের জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একজন অতিরিক্ত সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা তাঁর একার পক্ষে দেখা অসম্ভব।'

বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা সমকালকে বলেন, দেশের ৬৪ জেলায় শিশু একাডেমিগুলোকে প্রাথমিকভাবে অধিদপ্তরের কার্যালয় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ অধিদপ্তর হলে জনবল নিয়োগ ও ভবন তৈরির বিষয় রয়েছে।

আলাদা অধিদপ্তর গঠনের যৌক্তিকতা :দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশুর মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি শিশু দরিদ্র। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ প্রণীত শিশু অধিকার সনদে বাংলাদেশ সই করলেও 'শিশু অধিকার সংরক্ষণে' তেমন অগ্রগতি নেই।

বিশিষ্টজন বলেন, শিশু অধিকার রক্ষায় ২০১৩ সালে শিশু আইন হয়েছে। এই আইনে রয়েছে কিছুটা ঘাটতি। তা পূরণ করার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফোরাম থেকে সুপারিশও এসেছে।

এ ব্যাপারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, 'শিশুদের উন্নয়নে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সর্বপ্রথম শিশু বাজেট করা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত শিশু বাজেট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে গত দুই অর্থবছরে আর প্রকাশ করা হচ্ছে না। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটেও শিশুদের জন্য কিছু বলা হয়নি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের জন্য শুধু শিশুদের নিয়ে অধিদপ্তর করা খুবই প্রয়োজন।'

এ প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রকল্প পরিচালক (উপসচিব) আবুল হোসেন বলেন, 'বাল্যবিয়ে রোধসহ শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় বেসরকারি সংগঠন ও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বয়হীনতা ও তদারকির অভাব।'
এ ব্যাপারে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিশু ও সমন্বয় উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিবুজ্জামানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া যায়নি।