যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপ্রার্থীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। জোটের বৈঠকে অধিকাংশ নেতা পক্ষে মত দেওয়ায় তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এ বিজয়কে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় অর্জন বলে অভিহিত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদেমির জেলেনস্কি। বিষয়টি তাঁকে যতটা খুশি করেছে, তার চেয়ে বেশি পীড়া দিয়েছে পূর্বাঞ্চলীয় দোনবাসে রুশ সেনাদের আরেকটি বিজয়। দেশটির দ্বিতীয় প্রধান বাণিজ্যিক অঞ্চল লুহানস্কের শেষ দুটি নগরীও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। গতকাল শুক্রবার লুহানস্কের সেভেরোদনেটস্ক ও লাইসিচানস্ক থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করেছে কিয়েভ। ডোনেটস নদীতীরবর্তী নগরী দুটির অবস্থা এখন কঙ্কালসার।

ইউরোপীয় সীমানায় রাশিয়ার হামলার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইইউ নেতারা ইউক্রেন ও মলদোভাকে সদস্যপ্রার্থীর মর্যাদা দিয়েছেন। এ ছাড়া অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে জর্জিয়াকে। এর মাধ্যমে ইউরোপ ঐক্যের প্রমাণ দিয়েছে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠিন বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। ইইউর পূর্ণ সদস্যপদ পেতে ইউক্রেন ও মলদোভাকে আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপীয় মান অর্জন করলেই মিলতে পারে সদস্যপদ নামের সোনার হরিণ। তবে কিয়েভের ভবিষ্যৎ ইইউর মধ্যেই নিহিত বলে মন্তব্য করেছেন জেলেনস্কি।

দোনবাস দখলের অংশ হিসেবে লুহানস্কের ওপর প্রায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে রাশিয়া। সেভেরোদনেটস্ক ও লাইসিচানস্কে রুশ সেনাদের ব্যাপক হামলার মুখে টিকতে না পারায় সেখান থেকে সৈন্যদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গভর্নর সের্গেই গাইদায়। তিনি বলেছেন, সেভেরোদনেটস্ক এখন একটি ধ্বংসস্তূপের নাম। নগরীর প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধ থেমে গেলেও এই শহর কারও বসবাসের উপযোগী থাকবে না। এখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়ি ভেঙে পুনরায় তৈরি করতে হবে। সব জায়গায় শুধু রক্ত, ভবনের ভগ্নাংশ আর ধুলাবালির স্তূপ।
তিনি জানান, সেভেরোদনেটস্কের একটি রাসায়নিক কারখানায় উপর্যুপরি বোমা হামলা হচ্ছে। সেখানে এখনও কয়েকশ বেসামরিক মানুষ আটকে আছেন। তাঁদের প্রাণনাশের আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা লিলিয়া নেস্তেরেঙ্কো বলেন, বাড়িতে গ্যাস সরবরাহ নেই, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নেই পানির সরবরাহও। তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে খাবারের। এখানে আর জীবন ধারণের উপায় নেই। তবে ইউক্রেনের সৈন্যরা রুশ সেনাদের প্রতিহত করবে এবং তাঁদের ভাগ্য ফিরবে বলে ৩৯ বছরের এই নারীর আশা।

লুহানস্ক 'স্বাধীন' হওয়ার পথে মন্তব্য করেছেন সেখানে রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদী সেনাদের মুখপাত্র আন্দ্রেই মারোচকো। তিনি বলেন, আমাদের সেনারা যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে শিগগিরই লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিকের সম্পূর্ণ ভূমি স্বাধীন হয়ে যাবে। তবে সেভেরোদনেটস্ক আরও অন্তত ২ হাজার ইউক্রেন সেনাকে অবরুদ্ধ করা হয়েছে বলে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ভদ্মাদিমির পুতিনের সেনারা এখন আরও উত্তরে খারকিভের দিকে এগোচ্ছে এবং একই সঙ্গে দোনবাসের অন্য অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু খারকিভে হামলা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে ইউক্রেনকে চারটি বিধ্বংসী হিমারস রকেট সিস্টেমসহ আরও ৪৫ কোটি ডলারের সহায়তা দিচ্ছে ওয়াশিংটন। আরও সহায়তার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আসন্ন জি-৭ বৈঠক এবং ন্যাটো সম্মেলনে আলোচনা করবেন বলে দেশটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এদিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার জবাবে রাশিয়া তাদের জ্বালানি সম্পদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। মস্কো পশ্চিম দিকে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় এবং ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্য বের হতে না দেওয়ায় ইউরোপে চরম সংকটের পাশাপাশি খাবারের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে যাচ্ছে। জার্মানির অর্থমন্ত্রী রবার্ট হ্যাবেক বলেন, গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। দেশে দুই নম্বর সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এই জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যায়ী হতে হবে। সতর্কতা বাড়ালে নাগরিকদের গ্যাসের রেশন দিতে হবে। এই সময় গ্যাসের চাহিদা একটু কম থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ নাও হতে পারে। কিন্তু শীতে দেশের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। এর আগেই বিকল্প উৎস না পেলে নাগরিকদের ঠান্ডায় জমে যেতে হবে। সূত্র :এএফপি, আলজাজিরা, বিবিসি।