নান্দনিক স্থাপনা সবসময়ই দৃষ্টি আকর্ষণ করে, মন জুড়িয়ে নেয়। তার সঙ্গে যদি সার্বিকভাবে জীবনের গুণগত মানোন্নয়নের দিক বিবেচনায় থাকে, তা হয় সব থেকে আলাদা। এমন দুটি স্থাপত্যকর্ম নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার ২০২২-এ সংক্ষিপ্ত তালিকার ২০টি প্রকল্পের মধ্যে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের দুটি স্থাপত্য। এসব স্থাপত্যকর্মের ছবি লন্ডনের কিংস ক্রসে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে নির্মিত কমিউনিটি স্পেস ও ঝিনাইদহের আরবান রিভার স্পেস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৪৬৩টি প্রকল্প থেকে নির্বাচকরা এই ২০টি প্রকল্প বাছাই করেন।
আন্তর্জাতিক মহলে বরাবরই দেশের তরুণরা সাফল্য অর্জন করে এসেছে। এ অর্জন যেন তারই ধারাবাহিকতা। ২ জুন আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচারের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে এ বছরের মনোনীত প্রকল্পগুলোর তালিকা প্রকাশ করা হয়।
রোহিঙ্গা শিবিরের কমিউনিটি স্পেস
রোহিঙ্গা শিবিরের কমিউনিটি স্পেসটি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা কাঁচামালে তৈরি; যা টেকসই ও পরিবেশবান্ধব স্থাপনা। রোহিঙ্গা শিবিরে কমিউনিটি স্পেসের স্থপতি রিজভী হাসান, খাজা ফাতমী ও সাদ বিন মোস্তফা। কমিউনিটি স্পেসের আরেকটি মৌলিক দিক হলো, প্রথাগত পদ্ধতিতে কোনো নকশা বা মডেল তৈরি না করে তাঁরা সরাসরি রোহিঙ্গা কারিগরদের সঙ্গে কাজ করেছেন ও নির্দেশনা দিয়েছেন।
একেকটি স্থাপনার আয়তন ১২০০ থেকে ৫০০০ বর্গফুটের মতো। প্রতি বর্গফুটে তাঁদের খরচ হয়েছে মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার মতো। নারীবান্ধব ওই প্রকল্পের মাধ্যমে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের জন্য স্থাপত্যকর্মের সামনে আঙিনা তৈরি করা হয়েছে। তাদের কাউন্সেলিংসহ নানা দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও আছে সেখানে। বাঁশ, শন, গোলপাতা, বেতের মতো স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে টেকসই এই স্থাপনা।
ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের হয়ে কক্সবাজারে কর্মরত স্থপতি রিজভী হাসানের বাড়ি গাজীপুরে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ থেকে ২০১৭ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। ২০১৪ সালে কেনিয়ার স্থপতি এরিক সেজালের এক কনফারেন্সে অংশ নিয়ে মানবিক স্থাপত্য নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান তিনি। মানবিক কার্যক্রমে স্থাপত্যের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে বিশ্বের নজর কেড়েছেন এর আগেই। স্থপতি রিজভী হাসান ২০২০ সালের আগস্টে জাতিসংঘের 'রিয়েল লাইফ হিরো' স্বীকৃতি পান। কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাঁর কাজ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে যুক্তরাজ্যের 'দ্য গার্ডিয়ান' পত্রিকায়, যার শিরোনাম ছিল 'বিশ্বের সেরা ১০টি নতুন স্থাপনা'।
আরবান রিভার স্পেস
ঝিনাইদহের 'আরবান রিভার স্পেস'-এর স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির ও সোহেলি ফারজানা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক হাসিবুল কবির কো. ক্রিয়েশন আর্কিটেক্টসের প্রধান। তার কাজ পুরো এলাকার চিত্র বদলে দিয়েছে। নিজ এলাকা ঝিনাইদহের নদীর তীরঘেঁষে হাঁটার রাস্তা ও বাগানের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা ও সংস্কৃতিচর্চার জায়গা তৈরি করেছেন।
স্নাতক সম্পন্নের পর রিজভী পেশাচর্চার তালিম নিয়েছেন খন্দকার হাসিবুল কবিরের কাছে। তিনিই এবার রিজভীর সঙ্গে রয়েছেন আগা খান অ্যাওয়ার্ডের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসিবুল কবিরের অনন্য পরিচয়, তিনি 'গরিবের স্থপতি'। এই শিক্ষক একসময় বসবাস করতেন ঢাকার করাইল বস্তিতে। সেখানকার মানুষের সঙ্গে মিশে তিনি তাদের জন্য তৈরি করেছিলেন 'আশার মাচা'।
কম খরচে কীভাবে মানসম্মত বাসস্থানে বাস করা যায়, তা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দেখিয়েছেন হাসিবুল কবির। নিজ শহর ঝিনাইদহের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছেন এই স্থপতি। সেখানে ওই জনগোষ্ঠীর মানুষ নিজেরাই ইট-কাঠ-পাথর ব্যবহার করে নিজেদের ঘর বানিয়েছেন। বাইরে থেকে মিস্ত্রি প্রয়োজন না হওয়ায় খরচও হয়েছে অল্প। খন্দকার হাসিবুল কবির ২০০০ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর করেন, যেখানে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল 'হোমস্টিড'। পরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যে বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
এর আগে ২০১৯ সালে স্থপতি সাইফ উল হকের নকশা করা কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ কানারচরের আর্কেডিয়া এডুকেশন প্রজেক্ট আগা খান পুরস্কার লাভ করে। ২০১৬ সালে এই পুরস্কার জিতেছিলেন দুই বাংলাদেশি স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ও কাশেফ মাহবুব চৌধুরী।
স্থাপত্য পুরস্কারের ক্ষেত্রে আগা খান অ্যাওয়ার্ড সম্মানজনক পুরস্কার। এই পুরস্কার দেওয়া শুরু হয় ১৯৭৭ সাল থেকে। প্রতি তিন বছর পর এই সম্মাননা দেওয়া হয়। সামাজিক অগ্রগতি ও উন্নয়ন, সমকালীন নকশা, সামাজিক গৃহায়নসহ অনেক দিকই বিবেচনা করা হয় এতে। সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত বিজয়ীরা ১০ লাখ ডলার অর্থমূল্যের পুরস্কার ভাগ করে নেবেন। এখন পর্যন্ত ১২১টি প্রকল্প পুরস্কৃত হয়েছে এবং প্রায় ১০ হাজার ভবনের প্রকল্প নথিভুক্ত করা হয়েছে।