ইউক্রেনে ফের সর্বাত্মক হামলা শুরু হয়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় লুহানস্ক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর আক্রমণের কৌশল ও গতিপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে রাশিয়া। জোরদার করা হয়েছে বড় ধরনের আঘাত। এতে সদ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপ্রার্থী মর্যাদা পাওয়া দেশটি গতকাল শনিবার আবারও সিরিজ ক্ষেপণাস্ত্রে কেঁপে উঠেছে। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলীয় লাভিভে আঘাত হেনেছে ছয়টি এবং উত্তরের জাইতোমারে উড়ে গেছে আরও ৩০টি। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে ১০টি ঠেকানো গেলেও বাকিগুলো দুটি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানে। হামলায় এক সৈন্য নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় গভর্নর ভিতালিয়ে বুনেচকো জানিয়েছেন।
লুহানস্কের সেভেরোদোনেটস্ক ও লাইসিচানস্কে যুদ্ধ প্রায় শেষ। নগরী দুটি রুশ সেনারা অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। সেখান থেকে ইউক্রেনের সৈন্যরা সরে গেছেন। তবে সেভেরোদোনেটস্কের একটি স্টিল কারখানায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের সেনারা অব্যাহতভাবে বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছেন বলে স্থানীয় গভর্নর সের্গেই গাইদায় দাবি করেছেন। তিনি বলেন, সেখানে বিমান হামলাও চলছে। আজোত নামের ওই কারাখানায় তিন শতাধিক বেসামরিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে কেউ হতাহত হয়েছেন কিনা তিনি জানাতে পারেননি। লাভিভের গভর্নর মাকসিম কজিতাস্কি বলেন, ইউক্রেনে গতকাল রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টিবর্ষণ হয়েছে। সামরিক ঘাঁটি ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে একের পর এক মিসাইল ছোড়া হয়। হামলা হয়েছে পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তরে। আক্রমণ হয়েছে বেলারুশ সীমান্তবর্তী চারনিহিভ অঞ্চলেও। সেখানকার ছোট শহর দেসনায় আছে ইউক্রেন সেনাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তবে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিশ্চিত করতে পারেননি চারনিহিভের গভর্নর ভাইচেস্ল্যাভ চাউস।

প্রতিবেশী দেশ বেলারুশকেও ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে কিয়েভ অভিযোগ করেছে। চারনিহিভে যে হামলা হয়েছে তার সঙ্গে বেলারুশের সংশ্নিষ্টতা আছে বলে ইউক্রেনের গোয়েন্দারা দাবি করেছেন। সেনাবাহিনীর এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, গতকাল ভোর ৫টার দিকে অন্তত ২০টি রকেট ছুটে আসে বেলারুশ থেকে। রকেটগুলো দেসনায় আঘাত হানে। এতে কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বেলারুশ সীমান্ত থেকে এই জায়গার দূরত্ব মাত্র ৭০ কিলোমিটার। শনিবার প্রতিবেশী দেশটির প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন। এর আগেই হামলার ঘটনা ঘটে।

ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে আসা পোল্যান্ডের অন্তত ৮০ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে ক্রেমলিন জানিয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্কে একটি জিংক কারখানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালে ওই যোদ্ধাদের সঙ্গে ২০টি সামরিক যানসহ বেশ কয়েকটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মস্কোর সঙ্গে টানাপোড়েন শুরু হয় ওয়ারশোর। এর মধ্যেই এলো দেশটির নাগরিকদের হত্যার খবর। এ ছাড়া রাশিয়ার মোলেনস্কে একটি স্মৃতিফলক থেকে পোল্যান্ডের পতাকা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাদের হাতে নিহত হওয়া পোলিশদের আত্মার প্রতি সংহতি জানিয়ে নির্মিত ওই ফলকে এখন শুধু রুশ পতাকা উড়ছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, রাশিয়া সম্ভবত তাদের বেশ কয়েকজন জেনারেলকে ইউক্রেন থেকে সরিয়ে নিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অন্যত্র নেওয়ার এই প্রক্রিয়া জুনের গোড়ার দিকে শুরু হয়। তাদের মধ্যে বিমানবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল কর্নেল আন্দ্রেই সার্দেইকোভ অন্যতম। এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ইউক্রেনকে একটি 'খারাপ' শান্তিচুক্তিতে রাজি করানো হতে পারে।

তিনি বলেন, অনেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ইউরোপীয় যুদ্ধ বলছেন, এটা অবান্তর। তবে এটা সত্য যে, ইউরোপও ভুগছে। অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপেও ক্ষতি হচ্ছে। শুধু এই কারণেই মস্কোর সঙ্গে যেনতেন একটি শান্তিচুক্তির ব্যাপারে কিয়েভকে রাজি করানো হচ্ছে। সম্ভাব্য ওই চুক্তিতে ইউক্রেনের কোনো স্বার্থ থাকবে না। ভবিষ্যতের কথা ভেবে হয়তো তারাও সেটি মেনে নেবে। পুতিন যদি তাঁর পথেই হাঁটেন এবং ইউক্রেনে তাঁর স্বার্থ হাসিল হলে; তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে ভয়াবহ রকমের হুমকিতে ফেলবে, দেখা দেবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও। সূত্র :এএফপি, আলজাজিরা, বিবিসি।