ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীকে টানা তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ইনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। দুর্নীতির একটি মামলায় বৃহস্পতিবার তাঁর সংশ্নিষ্টতা নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই সরকারি সংস্থাটি। সোনিয়া গান্ধী ও তাঁর ছেলে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে জটিল আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে দলীয় তহবিল অপব্যবহার করে স্থাবর সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ এনেছে ইডি। তবে শুরু থেকেই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তাঁরা। বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে সোনিয়া ও রাহুল বারবার অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনে কেন্দ্রীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। মূলত বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অপরাধ নিয়ে তদন্ত করে থাকে ইডি।
'জেড প্লাস' ক্যাটাগরির নিরাপত্তাসহ সোনিয়া বৃহস্পতিবার দুপুরে ছেলে রাহুল আর মেয়ে প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে ইডি কার্যালয়ে হাজির হন। তবে যেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, প্রিয়াঙ্কা সেই কক্ষ থেকে দূরেই ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিকেলের আগেই তিনি ওই কার্যালয় ছাড়েন। এ সময় সোনিয়া গান্ধীকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে- এমন অভিযোগ এনে বাইরে বিক্ষোভ শুরু করেন কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ- ইডি বিজেপি সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছে। কংগ্রেস নেতাকর্মীদের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে বিজেপি। দিল্লিতে কংগ্রেসের বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে জলকামান ব্যবহার করতে হয়েছে। এ ছাড়া এদিন পার্লামেন্টের ভেতরেও কংগ্রেস নেতারা 'ইডির অপব্যবহার বন্ধ করো' ব্যানার নিয়ে মিছিল করেছেন।
একই মামলায় চলতি বছরের জুনে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন রাহুল। ওই একই সময়ে সোনিয়াকেও তলব করা হয়েছিল। তবে করোনা আক্রান্ত হওয়ায় সে সময় জিজ্ঞাসাবাদ এড়িয়ে যান তিনি। ৭৫ বছর বয়সী এই নেতাকে করোনা থেকে মুক্তিলাভের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একেবারে জুনের শেষের দিকে তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। এবারই প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েছেন সোনিয়া। জুনে একই মামলায় রাহুলকেও পাঁচ দিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল ইডি। ওই সময়ও প্রায় প্রতিদিনই দিল্লির রাস্তায় বিক্ষোভ দেখিয়েছিল কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা।
সোনিয়া গান্ধী ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে দলীয় তহবিলের অপব্যবহার করে ন্যাশনাল হেরাল্ড সংবাদপত্র প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান কেনার অভিযোগ এনে মামলাটি করা হয়েছে। মামলাটি দায়ের করেছেন বিজেপি নেতা সুব্রানিয়াম স্বামী। এ কারণেই মূলত মামলাটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে করা হয়েছে বলে মনে করছে কংগ্রেস। সুব্রানিয়াম স্বামীর অভিযোগ, গান্ধী পরিবার কংগ্রেসের পার্টি তহবিল এবং এজেএলের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার দিল্লি, মুম্বাইসহ বেশ কয়েকটি শহরে স্থাবর সম্পত্তি কিনেছে। এসব সম্পত্তির মূল্য দুই হাজার কোটি রুপি। তবে কংগ্রেস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং রাহুল গান্ধীর প্রপিতামহ জওহরলাল নেহরু ১৯৩৮ সালে ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকাটি প্রকাশ শুরু করেন। ১৯৩৭ সালে অ্যাসোসিয়েটেড জার্নালস লিমিটেড (এজেএল) নামে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো হয়, যেটি সংবাদপত্রটির প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করত। এটির শেয়ারহোল্ডার ছিলেন প্রায় পাঁচ হাজার স্বাধীনতা যোদ্ধা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর জওহরলাল নেহরু সংবাদপত্রটির বোর্ড চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করলেও ন্যাশনাল হেরাল্ডের ওপর প্রচুর প্রভাব ছিল নেহরুর। এ ছাড়া সংবাদপত্রটির মতাদর্শ নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখে কংগ্রেস। এই পত্রিকার মাধ্যমে পার্টি তহবিল জোগানো অব্যাহত রাখে কংগ্রেস। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন ভারতের সুপরিচিত কিছু সাংবাদিক ছিলেন যাঁদের কর্মজীবন শুরুই হয়েছে এই পত্রিকাটিতে কাজ করার মধ্য দিয়ে। ২০০৮ সালে আর্থিক সংকটের কারণে দৈনিকটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও ২০১৬ সালে এটির ডিজিটাল প্রকাশনা ফের চালু হয়। এটি এখনও চালু রয়েছে। বর্তমানে এই পত্রিকাটিকে অনেকেই কংগ্রেসের মুখপাত্র মনে করে থাকে। খবর এএনআই, এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার।