আয়মান আল-জাওয়াহিরি জন্ম মিসরের রাজধানী কায়রোর সম্ভ্রান্ত পরিবারে। লেখাপড়ায়ও ছিলেন ভালো। পড়েছেন কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিভাগে। তবে ছাত্রত্ব থাকাকালেই কট্টরপন্থি সংগঠনে যোগ দিয়ে তিনি ক্রমেই নিজেকে অন্ধকার জগতের দিকে ঠেলে দেন। হয়ে ওঠেন আল কায়দার 'আদর্শিক নেতা'।

গত রোববার আফগানিস্তানের কাবুলে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত জাওয়াহিরিকে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনের 'ডান হাত' বলা হতো। বিবিসি জানায়, এক সময়ের চোখের চিকিৎসক জাওয়াহিরি ২০১১ সালে বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর আল কায়দার শীর্ষ নেতা হন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন জাওয়াহিরি। ওই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের 'মোস্ট ওয়ান্টেডে'র তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে বিন লাদেনের পরই ছিল জাওয়াহিরির নাম। তাঁর মাথার মূল্য ঘোষণা করা হয় আড়াই কোটি ডলার।

আগেও কয়েকবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে জাওয়াহিরিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।

জাওয়াহিরির পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। তাঁর দাদা রাবিয়া আল-জাওয়াহিরি ছিলেন কায়রোর আল-আজহারের গ্র্যান্ড ইমাম। তাঁর এক চাচা ছিলেন আরব লিগের প্রথম মহাসচিব। স্কুলে পড়ার সময়ে জাওয়াহিরি ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে মিসরের নিষিদ্ধ সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও তাঁর পড়াশোনা থামেনি। তিনি ১৯৭৪ সালে কায়রো ইউনিভার্সিটি মেডিকেল স্কুল থেকে স্নাতক এবং এর চার বছর পর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। জাওয়াহিরির বাবা মোহাম্মদ ছিলেন একই মেডিকেল স্কুলের ফার্মাকোলজির অধ্যাপক। তিনি ১৯৯৫ সালে মারা যান। পড়াশোনা শেষ করার পর জাওয়াহিরি পরিবারের পথ অনুসরণ করছিলেন। কায়রোর কাছেই ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। তবে দ্রুতই তিনি চরমপন্থি ইসলামিক গ্রুপগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, যারা মিসরের সরকারকে উৎখাতের ডাক দিয়েছিল। ১৯৭৩ সালে তিনি ইসলামিক জিহাদ নামের সংগঠনে যোগ দেন। ১৯৮১ সালে ইসলামিক জিহাদের কয়েক সদস্য সেনাবাহিনীর পোশাক পরে কায়রোতে মিলিটারি প্যারেডে ঢুকে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করেন। এরপর ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকশ জনের সঙ্গে জাওয়াহিরিকেও আটক করা হয়। আনোয়ার সাদাত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থেকে জাওয়াহিরিকে মুক্তি দেওয়া হলেও অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে তাঁর তিন বছরের কারাদণ্ড হয়।

কারাগারে থাকার সময় জাওয়াহিরিকে প্রতিনিয়ত নির্যাতন করা হতো। ফলে ধর্মান্ধ এবং সহিংস জঙ্গিতে রূপান্তর ঘটে তাঁর। এমনটাই বলেছেন তখন তাঁর সঙ্গে কারাগারে থাকা অন্য কয়েদিরা। ১৯৮৫ সালে কারামুক্ত হওয়ার পর তিনি সৌদি আরব চলে যান। সেখান থেকে যান পাকিস্তানের পেশোয়ারে এবং পরে আফগানিস্তানে। দেশটিতে তিনি ইসলামিক জিহাদের শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। আফগানিস্তানে যখন সোভিয়েত আগ্রাসন চলছিল, তখন তিনি চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৯৩ সালে (মিসরীয়) ইসলামিক জিহাদ যখন পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে, তখন এর নেতৃত্ব নেন জাওয়াহিরি। সংগঠনটি মিসরের কয়েকজন মন্ত্রীর ওপর হামলা চালায়। এর মধ্যে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আতিফ সিদকি। সরকার উৎখাতেরও চেষ্টা চালায়। ৯০-এর দশকে সংগঠনটি ইসলামিক স্টেট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ সময় মিসরে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় আদালত জাওয়াহিরির মৃত্যুদণ্ড দেন।

ধারণা করা হয়, ১৯৯০ এর দশকে জাওয়াহিরি নিরাপদ আশ্রয় এবং অর্থ জোগাড়ের জন্য বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ান। তিনি বুলগেরিয়া, ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডে যান। ১৯৯৬ সালে তিনি রাশিয়ার গ্রেপ্তার হয়ে ছয় মাস কারাভোগ করেন। ১৯৯৭ সালে জাওয়াহিরি আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরে যান। সেখানে ওসামা বিন লাদেনের ঘাঁটি ছিল। এক বছর পর মিসরীয় ইসলামিক জিহাদ, আল কায়দাসহ পাঁচটি কট্টরপন্থি সংগঠন ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফ্রন্ট গঠন করে। পরে কেনিয়া ও তানজানিয়াতে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনায় ২২৩ জন নিহত হন। এরই মধ্যে ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলা হয়। এর জেরে বিন লাদেন নিহত হলে জাওয়াহিরি হন আল কায়দার শীর্ষ নেতা। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও উইকিপিডিয়ার।