তাইওয়ান চীনের আক্রমণের শিকার হলে ওয়াশিংটন কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবে- এ ব্যাপারে বছরের পর বছর এক ধরনের ইচ্ছাকৃত 'কৌশলগত অস্পষ্টতা' বজায় রেখে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ধারাবাহিকতায় স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের পর একটি কঠিন প্রশ্ন হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। তাইওয়ানকে ঘিরে বেইজিংয়ের সামরিক মহড়া শুরু হওয়ার পর কী উপায়ে এই দ্বীপরাষ্ট্রটিকে সাহায্য করা যায়, সেটির কার্যকর কোনো উত্তর মার্কিনিদের কাছে নেই। তবে এবার সম্ভবত বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময় হয়েছে। কারণ গত ২৫ বছরে প্রথমবারের মতো কোনো উচ্চ পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তা তাইওয়ান সফর করলেন এবং সেই সফরকে কেন্দ্র করে দ্বীপরাষ্ট্রটি ঘিরে চীনের একাধিক সামরিক মহড়া যে রাজনৈতিক সংকটের সূচনা করেছে, এর সমাধান এখন অতীব জরুরি। যদিও চীনের এই মহড়া তাইওয়ানের উপকূল থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে দূরে ছিল। তবুও চীনা এই পদক্ষেপকে তাইওয়ান এবং সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি 'উস্কানিমূলক' চপেটাঘাত হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়।
সম্পূর্ণ অনুমানের ওপর নির্ভর করে মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলছেন, তাইওয়ানকে উদ্দেশ্য করে চীনের এই প্রতিক্রিয়ার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বেইজিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে। কিন্তু এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে চীনের নিজস্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চীনা অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জাতীয় অর্থনীতিও ভেঙে পড়বে। সুতরাং এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ কতটুকু বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত হবে, তা প্রশ্নের দাবিদার। শিল্পোন্নত দেশগুলোর গ্রুপ জি-৭ পেলোসির তাইওয়ান সফরের প্রতিশোধ না নেওয়ার জন্য চীনকে আগেই সতর্ক করেছিল। বেইজিংকে 'পরামর্শ' দেওয়া হয়েছিল- অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোনো চেষ্টাকে জি-৭ 'ভালো চোখে' দেখবে না। তবে চীন সরকার যে পশ্চিমা জোটের কথায় কর্ণপাত করেনি, চলমান সামরিক মহড়ার মাধ্যমেই তা প্রমাণিত হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এও বলছেন, তাঁরা উদ্বিগ্ন যে আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের একটি অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে চীন তাইওয়ানের ওপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে অথবা বিতর্কিত আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ করে সংঘর্ষকে উস্কে দিলে এই দুটি ভূখণ্ডের সংঘর্ষ কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্নেষকরা এমন সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, চীন তাইওয়ানের উপকূলের কাছাকাছি প্রতিটি এলাকায় বাহিনী পাঠাচ্ছে কিনা তা বুঝতে হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁদের মূল্যায়ন হলো, চীনের কৌশল হচ্ছে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে দ্বীপরাষ্ট্রটিকে ভয় দেখানো এবং নতিস্বীকারে বাধ্য করা। তাইওয়ান যদি মাথা না নোয়ায় তাহলে চীনের এই প্রচেষ্টা প্রলম্বিত হতে পারে।
ওয়াশিংটনের স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চায়না পাওয়ার প্রজেক্টের প্রধান বলেন, 'চীনের এই সামরিক মহড়ার মূল উদ্দেশ্য পরিস্কার নয়। যদি এই মহড়া ধীরে ধীরে অবরোধে রূপান্তরিত হয়, তাহলে এটি কখন এবং কীভাবে স্পষ্ট হবে? চীনের বিরুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ কে নেবে? তাইওয়ান নাকি যুক্তরাষ্ট্র? এটি এখনও স্পষ্ট নয়।' সংগত কারণেই ওয়াশিংটনের নিত্যসঙ্গী হচ্ছে যুদ্ধ। আর প্রতিটি যুদ্ধে জড়ানোর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্নেষকরা তথ্য-উপাত্ত দ্বারা আসন্ন সম্ভাব্য সব ধরনের সংকট অনুমানের চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবতা আসলেই ভিন্ন, অনুমানের মাধ্যমে তা কখনোই টের পাওয়া যায় না।

বিষয় : তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্নিপরীক্ষা

মন্তব্য করুন