সরকারি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির মামলায় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও তার সহযোগী অর্পিতা মুখোপাধ্যায়কে আর নিজেদের হেফাজতে চাইছে না ইডি। তাদের ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন ব্যাঙ্কশাল বিশেষ আদালত। আগামী ১৮ আগস্ট তাদেরকে আদালতে হাজির করা হবে। তবে জেল হেফাজতে থাকাকালীন তাদের জেলে গিয়ে জেরা করতে পারবেন ইডির আধিকারিকরা। 

আজ শুক্রবার জোকা ইএসআই হাসপাতালে পার্থ ও অর্পিতার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এরপর ব্যাঙ্কশাল আদালতে তোলা হয়। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিচারক জানান, আপাতত পার্থ চট্টোপাধ্যায় থাকবেন প্রেসিডেন্সি জেলে এবং অর্পিতার ঠিকানা আলিপুর সংশোধনাগার।

এদিন শুনানি চলাকালীন ফের প্রভাবশালী তত্ত্বে পার্থ চট্টোপাধ্যায় জাবিনের আবেদনের বিরোধিতা করেন ইডির আইনজীবী। এই সময় পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা প্রভাবশালী তত্ত্ব খারিজে জোর দেন প্রাক্তন মন্ত্রীর আইনজীবী কৃষ্ণচন্দ্র দাস। তিনি বলেন, পার্থ চট্টোপাধ্যায় এখন মন্ত্রী নন। কোনো দলীয় পদেও নেই। তিনি এখন শুধুই একজন বিধায়ক। আর সেই পদ থেকেও ইস্তফা দিতে রাজি। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কোনো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়নি। ডিড যা উদ্ধার হয়েছে তা নকল। ঘুষ নেওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সিবিআই তাঁর বিরুদ্ধে কোনো তথ্য পায়নি। পার্থকে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তিনি বলির পাঁঠা। উনি একজন সাধারণ মানুষ। তাঁর কোথাও পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তদন্ত যা হওয়ার হয়ে গেছে। আর নতুন কোনো তথ্য পাওয়ার নেই।

পাল্টা ইডির আইনজীবী জানান, ২০১২ সালের ২০ জানুয়ারি একটি ডিড তৈরি হয়েছিল। অনন্ত টেক অ্যাপ লিমিটেড সংস্থার নামে শেয়ার কেনাবেচা হয়েছিল। ওই ডিডে অর্পিতার নামে বেলঘরিয়ার রথতলার ফ্ল্যাটের ঠিকানা উল্লেখ ছিল। ওই সংস্থার মাধ্যমে অর্পিতা ও পার্থর পরিবারের মধ্যে শেয়ার কেনাবেচার প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া ৫০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং একটি ট্রাস্টের খোঁজ মিলেছে। ৩১টি এলআইসির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। অর্পিতার নামে থাকা ওই এলআইসি পলিসিগুলির নমিনি পার্থ চট্টোপাধ্যায়।  এখনো অ্যাকাউন্টের ফরেনসিক অডিট করতে হবে। পার্থের সিজার লিস্ট খতিয়ে দেখে ভবিষ্যতে কথাবার্তা বলার প্রয়োজন রয়েছে। তাই দুজনকে জেল হেফাজতে রেখে আরও জেরার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।  

দুই পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর পার্থর জামিনে আবেদন খারিজ করে দেন বিচারক। এদিনও অর্পিতার আইনজীবীর পক্ষ থেকে তার জামিনের আবেদন করা হয়নি। যদিও সরকারি আইনজীবী ফিরোজ এডুলজি দাবি করেন, অর্পিতা উচ্চশিক্ষিত। তাঁর জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। তাই খাবার ও জল পরীক্ষা করে দিতে হবে। অন্যদিকে ‘প্রথম শ্রেণির কয়েদি’ হিসেবে জেলে রাখার আবেদন করেন অর্পিতার আইনজীবী সোহম বন্দ্যোপাধ্যায়। 

এদিকে ইডি সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার অর্পিতা মুখোপাধ্যায় ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে অর্পিতাকে চেনেন না বলে দাবি করেন পার্থ।  ইডির পক্ষ থেকে পার্থকে প্রশ্ন করা হয়, 'অর্পিতাকে চেনেন?' উত্তরে তিনি জানান, 'না, তেমনভাবে চিনি না।' ইডির পালটা প্রশ্ন, 'তাহলে কীভাবে চেনেন?' পার্থর জবাব, 'অনেকেই আসেন আমার কাছে। তাই দেখেছি। নাকতলার পুজোতেও দেখেছি।' পার্থকে জিজ্ঞাসা করা হয়, 'অর্পিতার ফ্ল্যাট থেকে এত টাকা উদ্ধার হয়েছে, জানেন?' পার্থর উত্তর, 'শুনেছি, তবে ওই টাকা আমার নয়।' এমন ঘটনায় পার্থ-অর্পিতার সম্পর্কের গভীরতা এখন চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এদিকে মামলার শিকড়ে পৌঁছাতে প্রাক্তন মন্ত্রীর মেয়ে সোহিনী ভট্টাচার্য ও জামাই কল্যাণময় ভট্টাচার্যকে তলব করেছে ইডি। বর্তমানে তাঁরা আমেরিকায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। যত দ্রুত সম্ভব কলকাতায় এসে ইডি দপ্তরে তাঁদের দেখা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ সরকারি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগে গত ২৩ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে। ২৪ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয় তার সহযোগী অর্পিতা মুখোপাধ্যায়কে। এ সময় তল্লাশি চালিয়ে অর্পিতার টালিগঞ্জ এবং বেলঘড়িয়া থেকে উদ্ধার হয় প্রায় ৫২ কোটি রুপি এবং সোনা ও হীরার গহনাসহ নামে-বেনামে প্রচুর সম্পত্তি।