বিজেপি-জেডিইউর মধুচন্দ্রিমায় ইতি ঘটিয়ে বিহারের রাজনীতিতে ফিরতে চলেছে মহাজোট। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিলেন নীতীশ কুমার। মঙ্গলবার রাজ্যপাল ফাগু চৌহানের কাছে নিজের ইস্তফাপত্র দিয়ে দিয়েছেন নীতীশ। যার অর্থ বিহারে সরকারিভাবে এনডিএ (এনডিএ) জমানার অবসান ঘটল।

ইস্তফা দেওয়ার পর বিহারের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তার দলের সব সংসদ সদস্য ও বিধায়ক একযোগে এনডিএ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই মন্ত্রিসভায় ১৬ জন বিজেপির মন্ত্রীও ছিলেন। মন্ত্রিসভা ভেঙে যাওয়ায় তারাও পদ হারালেন।

রাজ্যপালের কাছে ইস্তফা দেওয়ার পরই রাজভবন থেকে সোজা তেজস্বী যাদব এবং রাবড়ি দেবীর বাসভবনে যান তেজস্বী ও নীতিশ।  সেখানেই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক হবে বলে জানানো হয়েছে জেডিইউ সূত্রে। 

নতুন সরকারের ফর্মুলা অনুযায়ী আসন সংখ্যা কম নিয়েও মুখ্যমন্ত্রীত্ব থাকতে পারে নীতিশের জেডিইউর হতেই। 

বর্তমানে বিহার বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তেজস্বী যাদব উপ-মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। তার হাতে স্বরাষ্ট্র দপ্তর থাকবে।

আরজেডি সূত্রের খবর, ২০১৫ সালের মতোই ১৫ জন মন্ত্রী পেতে পারে আরজেডি। স্পিকার পদে পেতে পারে কংগ্রেস।

গত কয়েক মাস ধরেই নানা ইস্যুতে জোটসঙ্গী বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে নীতীশের জেডি (ইউ)-এর। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজেও দেখা যায়নি নীতীশকে। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে নীতি আয়োগের বৈঠকও এড়িয়েছেন নীতীশ। এর মধ্যেই জেডিইউ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা আপাতত এনডিএ জোটের অংশ হলেও নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার অংশ হবে না।  

বিজেপিকে ঠেকাতে ২০১৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে, নীতিশের দল জেডিইউ, লালু প্রসাদ যাদবের দল আরজেডি ও কংগ্রেস মিলিয়ে মহাজোট গঠিত হয়। ২০১৭ সালে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আরজেডি-সঙ্গ ছেড়ে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গড়েন নীতীশ। ২০২১ সালে বিধানসভায় বিজেপির তুলনায় কম আসন পাওয়া সত্ত্বেও নীতীশকে মুখ্যমন্ত্রী করে পুরনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিল বিজেপি। প্রশ্ন উঠছে তারপরও কী এমন হলো যাতে সরকার তৈরির দু’বছর না ঘুরতেই এই বড় সংঘাত?

সমীকরণ বলছে ২৪৩ আসনবিশিষ্ট বিহার বিধানসভায় জেডি (ইউ)-র আসনসংখ্যা ৪৫, বিজেপির ৭৭। অন্য দিকে আরজেডি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের দখলে ১১৬টি আসন। সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় আসনসংখ্যা ১২২। এমন অবস্থায় জোটের সহযোগিতায় সরকার চালানোর জন্য বারবার নীতিশ কুমারকে হীনবল ও অপমান করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে বারবার অভিযোগ করেছে জেডিইউ। বিহারের বিজেপি নেতারা নীতীশের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন, এমনটিও জানা গিয়েছে। 

নীতিশের দলের নেতারা বলছেন, সমস্যা একদিনের নয়। জোটসঙ্গী হিসেবে প্রাপ্য মর্যাদা পাচ্ছিলেন না তারা। কেন্দ্রে মন্ত্রিসভা গঠন থেকে বিহার বিধানসভায় নীতীশ কুমারের সঙ্গে স্পিকারের বচসা। একাধিকবার অপমানিত হয়েছেন তারা। জেডিইউ-র অভিযোগ, বিহার বিধানসভার স্পিকার বিজয় কুমার সিংহ-কে সরানোর জন্য নীতীশ কুমারের অনুরোধে কর্ণপাত করেনি বিজেপি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাতে স্থান পাওয়া নিয়েও অসন্তুষ্ট  ছিল জেডিইউ।

সূত্রের খবর, কেন্দ্রের বেশ কয়েকটি উন্নয়ন র্যা ঙ্কিংয়ে বিহারকে নিচের দিকে রাখায় ক্ষুব্ধ ছিলেন নীতিশ ।

এই বিরোধে সর্বশেষ সংযোজন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আর সি পি সিং-এর সঙ্গে বিবাদ। নীতীশ কুমারকে না জানিয়েই জেডিইউ সংসদ সদস্য আরসিপি সিংকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব দিয়েছিল মোদি সরকার। যা মোটেও ভালভাবে নেয়নি বিহারের জেডিইউ নেতৃত্ব। এর জবাব হিসেবে এবার আর বিজেপি ঘনিষ্ঠ আরসিপি সিংকে রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হিসেবে পাঠায়নি নীতীশের দল। ফলে মন্ত্রিত্বও ছাড়তে হয়েছে তাকে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বর পাশাপশি জেডিইউ থেকে ইস্তফা দিয়ে নীতীশকে তুলোধোনা করেছিলেন আরসিপি সিং।

আবার বিহার বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ ছিল, সরকার পরিচালনায় দলের মন্ত্রীদের পাত্তা দেন না নীতীশ। সরকারে আরও বেশি করে কর্তৃত্ব চাইছিল গেরুয়া শিবির। সূত্রের খবর, আগামী লোকসভা নির্বাচনে নীতিশের হাত ছেড়ে নির্বাচনে একক লড়াই করতেও চাইছিল বিহার বিজেপির একাংশ। যদিও চলতি মাসেই বিহারের রাজধানী পাটনায় এসেছিলেন বিজেপি শীর্ষ নেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। 

দলের বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি জানিয়ে দেন, ২০২৪-এর লোকসভা ও ২০২৫-এর বিধানসভা নির্বাচনে একসঙ্গেই লড়বে বিজেপি-জেডি(ইউ)। একই সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয় আসন সংখ্যায় কম থাকলেও এনডিএ-র মুখ থাকবেন নীতীশ কুমারই। তবে এরপরও নীতীশ কুমারের মনের সংশয় কাটেনি। বিহারের রাজনীতি-সরকার পরিচালনায় অমিত শাহ হস্তক্ষেপ করছেন বলে পাল্টা অভিযোগ তুলেছিল জেডিইউ।

নীতীশের এই সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করে দিল্লীর বিজেপি নেতৃত্ব বলছে, বিহারে জোট সরকারে যে একটি সমস্যা হচ্ছে, তবে তা দ্রুত কেটে যাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন তারা। যদিও তারপরও নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন জেডিইউ নেতা। মহারাষ্ট্রের অপারেশেন লোটাস দেখার পরে নিজের গদি নিয়েই কার্যত আশঙ্কায় ভুগছিলেন নীতীশ। বিজেপির কলকাঠি নাড়ার আগেই বিরোধীদের নিয়ে সরকার গড়ার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করতে নেমে পড়েছেন পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ নীতীশ কুমার। ফোনে কথা বলেছেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে।

এরপরে আরজেডির সঙ্গেও একান্তে বৈঠক করেন নীতীশ। বিহার বিধানসভার বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বিধায়ক রয়েছে আরজেডির কাছে। এনডিএ থেকে বেরিয়ে এসে জেডিইউ, কংগ্রেস এবং আরজেডির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফের মহাজোট গড়ে অনায়াসে বিজেপিকে সরকার থেকে উৎখাত করলো মহাজোট। মহাজোটের নেতা নির্বাচন করা হয়েছে নীতিশ কুমারকে।