পশ্চিমা দুনিয়ার চোখে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটানো সংস্কারক হলেও সমাজতন্ত্রীদের কাছে মিখাইল গর্বাচেভ একজন বিশ্বাসঘাতক। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই শেষ নেতার মৃত্যুতে তিন যুগের পুরোনো মতভিন্নতা আবার আলোচনায়।

কমরেড গর্বাচেভের বিখ্যাত পেরেস্ত্রোইকা (পুনর্নির্মাণ) ও গ্লাসনস্ত (উদারীকরণ) নীতি বাস্তবায়নচেষ্টার পরিণামে অবিভক্ত সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটে। সমাজতন্ত্রীদের চোখে তা বিশ্ব প্রগতিশীল আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। কিন্তু অনেকের মতে সারাজীবন কমিউনিস্ট রাজনীতি করা গর্বাচেভের নীতি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোকে গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধির সুযোগ দিয়েছিল। যদিও সোভিয়েত ভেঙে জন্ম নেওয়া বেশিরভাগ দেশ সমাজতন্ত্র ছাড়লেও গণতন্ত্রের পথে হাঁটেনি। ১৯১৭ সালে ভদ্মাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লবে রাজতন্ত্রের উৎখাত হয় এবং ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে ক্রমে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্ভব হয়, বিশ শতকে যা বিশ্বে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সমকালকে বলেছেন, শ্রমিক আন্দোলনে এই মহান অর্জনের পিঠে গর্বাচেভ ছুরি মেরেছেন। বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ নেতার পদে উঠে এলেও, গর্বাচেভকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র একজন মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাঁর ভ্রান্ত নীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। সারা দুনিয়ার প্রগতিশীল আন্দোলনের অপূরণীয় সর্বনাশ হয়েছে এতে। পশ্চিমারা তাঁকে যেভাবেই মূল্যায়ন করুক, গর্বাচেভ ইতিহাসে একজন খলনায়ক হয়ে থাকবেন।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েতের পতনের পরও, ইউনিয়ন ভেঙে জন্ম নেওয়া রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান পদে মাস ছয়েক টিকে ছিলেন গর্বাচেভ। সামরিক অভ্যুত্থান ও তার ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বহুদিন বিশ্বরাজনীতির উল্লেখযোগ্য নাম হয়েছিলেন গর্বাচেভ। রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টায় ১৯৯৬ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে এক শতাংশেরও কম ভোট পেয়ে গোহারা হারেন। একে তাঁর প্রতি রাশিয়ানদের ঘৃণার বার্তা হিসেবে দেখা হয়।

প্রায় দুই যুগ নিভৃতে কাটানোর পর গত মঙ্গলবার ৯১ বছর বয়সে মৃত্যু হয় গর্বাচেভের। তিনি ১৯৮৫ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তথা দেশের সর্বোচ্চ নেতার পদে বসেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশের মতে, গর্বাচেভ একজন অবিমৃষ্যকারী। তিনি পরিণতি না ভেবে কিংবা পরিণতি সম্পর্কে সচেতন না হয়ে কাজ করেছিলেন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি রাজনীতির আগে অর্থনৈতিক সংস্কার করেছে। তার সুফল পাচ্ছে চীন। অর্থনৈতিক শক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনকারী চীন ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংস্কারের দিকে যেতে পারে। কিন্তু গর্বাচেভ স্থবির সোভিয়েত অর্থনীতি সংস্কারের আগে, রাজনৈতিক সংস্কার শুরু করেন। এর ফল হয়েছে ভয়াবহ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে সারা দুনিয়ার প্রগতিশীল আন্দোলনে আঘাত এসেছে।
তবে গর্বাচেভকে সংস্কারক ও ভ্রান্ত দুই-ই মনে করেন অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন। তাঁর মতে, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের যে ত্রুটিগুলো, তা সারানোর সাহস গর্বাচেভ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ভুল নীতিতে ফল ভালো হয়নি। তবে, সংস্কারের জন্য যে সাহস দরকার, তা গর্বাচেভের ছিল।

প্রায় ৭০ বছর পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের। পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প ছিল। সোভিয়েতের পতনে এককেন্দ্রিক বিশ্বে বাজার অর্থনীতির অপ্রতিদ্বন্দ্বী উত্থান ঘটে। দেশে দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন শক্তি হারায়।

পশ্চিমাদের চোখে স্নায়ুযুদ্ধের শান্তিপূর্ণ অবসানের রূপকার গর্বাচেভ মস্কোর সেন্ট্রাল ক্লিনিক্যাল হাসপাতালে মারা যান। কয়েক বছর ধরে গর্বাচেভের স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল। কমিউনিস্টদের কাছে 'সোভিয়েতের গোরখোদক' হিসেবে পরিচিত এ নেতার মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। তবে পশ্চিমাদের কাছে তিনি 'সোভিয়েতের কারাগারে বন্দি কোটি মানুষের মুক্তিদাতা'। অন্যদিকে কোটি রাশিয়ানের মতে তিনি রাশিয়ার বৈশ্বিক প্রভাব 'মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন'।

সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনের তৎকালীন নেতা ভদ্মাদিমির রোগভ বলেন, গর্বাচেভ ইচ্ছা করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটান। তিনি একজন বিশ্বাসঘাতক।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গর্বাচেভের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে তাঁকে ইতিহাস বদলে দেওয়া রাষ্ট্রনায়ক বলে আখ্যা দিয়েছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন শোক জানিয়ে বলেছেন, গর্বাচেভ গভীরভাবে বুঝতে পেরেছিলেন সংস্কার প্রয়োজন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শোক জানিয়ে বলেছেন, গর্বাচেভ অসাধারণ দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার কমাতে কাজ করেছিলেন। কয়েক দশকের নিষ্ঠুর রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পর সোভিয়েত ইউনিয়নকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে এসেছিলেন।

দুই জার্মানির শান্তিপূর্ণ একত্রীকরণে অবদানের জন্য ১৯৯০ সালে নোবেল শান্তি পদকজয়ী গর্বাচেভের মৃত্যুতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনসহ বিশ্বনেতারা শোক জানিয়েছেন।

১৯৩১ সালে কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া গর্বাচেভ ১৯৫৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে পরের ৩১ বছরে শীর্ষ পদে পৌঁছান। আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনা পাঠানোর নীরব বিরোধীদের একজন ছিলেন গর্বাচেভ। রাশিয়ায় মতপ্রকাশের অভাবনীয় সুযোগ দেন। তাঁর সময়েই রাশিয়ার আইনসভার প্রথম অবাধ নির্বাচন হয়। অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে নিকিতা ক্রুশ্চেভের পথ ধরে জোসেফ স্তালিনের আমলের কঠোর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শাসনকাঠামো ভেঙে ফেলেন। তবে এসব সংস্কার সোভিয়েতকে দুর্বলতর করে পতনের পথে নিয়ে যায়। পুতিনের মতে যা বিশ শতকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়।