হাতছাড়া হয়ে যাওয়া পূর্বাঞ্চল পুনরুদ্ধারে মরণপণ লড়াই করছে ইউক্রেনের সেনারা। বাড়িয়েছে যুদ্ধ সরঞ্জাম আর সৈন্য সংখ্যা। উত্তর-পূর্ব খারকিভ অঞ্চলে নিয়োজিত এক রুশ কর্মকর্তা বলেছেন, পাল্টা আক্রমণে রুশ বাহিনীর চেয়ে ইউক্রেনীয় সেনার সংখ্যা প্রায় ৮ গুণ বেশি। এতে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, একটি মানচিত্র প্রকাশ করে গত রোববার রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, এরই মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ খারকিভ অঞ্চলই ছেড়ে দিয়েছে রুশ সেনারা। খবর এএফপি ও আলজাজিরার।
রুশ কর্মকর্তা ভিটালি গানচেভ জানান, ইউক্রেনীয় সেনারা এই অঞ্চলের উত্তরে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো দখল করেছে। তারা রুশ সীমান্তেও প্রবেশ করেছিল। পাল্টা আক্রমণ শুরুর পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার বেসামরিক নাগরিককে রাশিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার রাষ্ট্রীয় টিভি রাশিয়া টোয়েন্টিফোরকে গানচেভ বলেন, পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে, রাশিয়ার বেলগোরোড অঞ্চলের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রবল প্রতিরোধে ইউক্রেনীয় বাহিনী খারকিভ অঞ্চলের ইজিয়াম ও কুপিয়ানস্ক জেলায় গড়ে তোলা রুশ বাহিনীর প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলো দখল করে নেয়। গতকালও রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের গতি বজায় রেখেছিল ইউক্রেনীয় সেনারা। উত্তর-পূর্ব খারকিভ অঞ্চলের আঞ্চলিক গভর্নর ওলেহ সিনেহুবভ বলেছেন, আরও কিছু এলাকায় এরই মধ্যে ইউক্রেনীয় সেনারা সীমান্তের কাছে পৌঁছে গেছে।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ২০টিরও বেশি এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে সেনারা। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেক্সি রেজনিকভ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, পাল্টা আক্রমণ প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হয়েছে। রাশিয়া পরাজিত হতে পারে, এটিই তার লক্ষণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, যুদ্ধ পরিস্থিতি আকস্মিক মোড় নেওয়াকে স্বাভাবিক বলেছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। কারণ, রুশ বাহিনীর সামনে ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছে, এ বিষয়ে তাঁরা সতর্কও করেছিলেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার গতকাল বলেছে, ইউক্রেনে প্রতিরক্ষা জোরদারে পর্যাপ্ত সেনা সদস্যের সম্ভবত অভাব রয়েছে রাশিয়ার। সংস্থাটি বলছে, যদিও যুদ্ধ আগামী বছর পর্যন্ত চলতে পারে। পশ্চিমাদের দেওয়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং কৌশলের কার্যকর ব্যবহার করে ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি তার অনুকূলে নিতে পেরেছে। এমন পরিস্থিতিতে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ সোমবার বলেছেন, ইউক্রেন নিয়ে আলোচনার বিরুদ্ধে নয় রাশিয়া। তবে ইউক্রেন যত বেশি সময় নিচ্ছে, কোনো বিষয়ে একমত হওয়া ততই কঠিন হবে।
এদিকে, টিকতে না পেরে প্রতিশোধ হিসেবে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এর মধ্যে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও রয়েছে। ফলে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিশাল এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। অঞ্চলটিতে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে। এ হামলার পর ইউক্রেন ও পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার ব্যাপক সমালোচনা করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এগুলো যে সন্ত্রাসীদের কাজ, তা ইউক্রেন ও সভ্য বিশ্ব দেখছে। যুদ্ধক্ষত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর এমন হামলা 'কাপুরুষোচিত' বলে উল্লেখ করেছেন জেলেনস্কি। রুশ বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পালিয়ে গেলেও ইজিয়াম জেলা হাতছাড়া হওয়ার কথা স্বীকার করতে রাজি নন পুতিনের মিত্র চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ। টেলিগ্রামে পোস্ট করা ১১ মিনিটের অডিও বার্তায় তিনি বলেন, রুশ বাহিনীর পক্ষ হয়ে তাঁর বাহিনী সম্মুখ সারিতে যুদ্ধ করছে। তবে অভিযান পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে না বলে স্বীকার করেন তিনি।
এদিকে, ইজিয়াম পরাজয়ের বিষয়ে এখনও মুখ খোলেনি মস্কো। রুশ প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন কিংবা তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু কেউ-ই গতকাল পর্যন্ত মন্তব্য করেননি। যদিও দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় টেলিগ্রামে বলেছে, খারকিভ অঞ্চলে রুশ সেনারা কুপিয়ানস্ক ও সেনকোভোসহ অন্তত ৯টি এলাকায় ইউক্রেনীয় বাহিনীকে পরাজিত করেছে। ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কী ঘটছে, তা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা না দেওয়ায় রুশপন্থি ও জাতীয়তাবাদীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ঝাড়ছেন।